শুক্রবার ১২ আগস্ট ২০২২ ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯

শিরোনাম: ক্রিকেট নাকি বেটিং, সাকিবকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: পাপন    জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার নির্দেশ    ডলারের কারণে ভোজ্যতেলের দামে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না: বাণিজ্যমন্ত্রী    রাজধানীতে হোটেলে মিলল নারী চিকিৎসকের গলাকাটা লাশ    সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা সম্পর্কে সরকার কেন তথ্য চায়নি: হাইকোর্ট    জম্মু-কাশ্মীরে সেনা ক্যাম্পে হামলা, ৩ সেনাসহ নিহত ৫    বিশ্বব্যাপী বেড়েছে মৃত্যু-শনাক্ত   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
চট্টগ্রামের ৩৪ মৃত্যুকূপ!
বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেই
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুন, ২০২২, ১০:০৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৪টি পাহাড়ের প্রতিটির পাদদেশই যেন একেকটি মৃত্যুকূপ'। মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে এসব স্থানে বসবাস করছে অন্তত দুই হাজার পরিবার। প্রতিটি পরিবারে গড়ে চারজন হিসাবে এই ৩৪টি মৃত্যুকূপে  অবৈধভাবে বসবাস করছেন প্রায় আট হাজার মানুষ। যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। কিন্তু গত কয়েক বছরে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও এসব পাহাড়ের বাসিন্দাদের পুরোপুরি সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন।

যদিও প্রশাসনের ভাষ্য, প্রতিবছরের মতো এবছরও বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের শঙ্কা ছিল। যা প্রশাসন আঁচ করতে পেরেছে। তাই সেখান থেকে সরে যেতে তাগাদাও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনভাবেই পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরানো যায়নি।

এমনকি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো উচ্ছেদ করতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় জেলা প্রশাসন। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ নিয়ে পাহাড়েই বসবাস করছে শত শত পরিবার। যার কারণে ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনা।

তবে অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

শনিবার (১৮ জুন) নগরের বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ, হিল-১, হিল-২ এবং বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়, ফয়েজ লেক সংলগ্ন ১ নম্বর  ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল, আমিন জুট মিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়,  সেখানে ঝুঁকি নিয়ে শত শত পরিবার তাদের বসতঘর তৈরি করেছেন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সেখান থেকে  বেশকিছু পরিবারকে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হলেও কিছু পরিবার থেকে যায়। 

এর আগে শুক্রবার (১৭ জুন) সকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করা হয়। প্রস্তুত রাখা হয় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, কাট্টলি ও চান্দগাঁও সার্কেলাধীন ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়াও সীতাকু- উপজেলা,  রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, চন্দনাইশ, হাটহাজারী, লোহাগাড়াতেও পাহাড় ধস এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাডের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনার পরও অনেক পরিবার রাতেই ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে থেকে যায়। যার কারণে শুক্রবার (১৭ জুন) দিনগত রাত ১টার দিকে আকবর শাহ থানাধীন বরিশাল ঘোনা ও রাত ৩টার দিকে ফয়’স লেকের বিজয় নগর এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ৪ জন নিহত হন। এছাড়াও আহত হয়েছেন ২ জন।

দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রতিবছর  কোনো না কোনো জায়গায় পাহাড় ধসে ঘটছে প্রাণহানি। গত ১৩ বছরে পাহাড় ধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃদ্যু হলেও থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। টানা ভারি বৃষ্টিতেও পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে অনেক পরিবার। তাদের সরানো হয় শুধু বর্ষা মৌসুমে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড় ধসের শঙ্কা বাড়ে। এর পর কিছু উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। ভারি বৃষ্টি হলে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে রাখেন তারা। বর্ষা চলে গেলে আর কোনো খবর থাকে না। যার কারণে প্রতিবছর পাহাড় ধসে প্রাণহানি হচ্ছে, ক্ষতি হচ্ছে সম্পদ। এতগুলো প্রাণহানির দায়িত্ব কে নিবে?

তিনি আরও বলেন, যদি স্থায়ী কোনও সমাধান না হয় তাহলে প্রাণহানি আরও বাড়বে। নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ। তাদেরকে সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দিচ্ছে কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী। আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরিকল্পিত নগরীতে কোনো পরিকল্পনা নেই। যদি পরিকল্পনা থাকতো তাহলে তাদের কোথাও স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া যেত।

ঝুঁকিপূর্ণ ৩৪ পাহাড় চিহ্নিত 
নগরে ৬৫ পাহাড়ের মধ্যে ৩৪ পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। এর মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার বসবাস করছে। অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৫৩১টি। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৩০৪টি।

বসবাসকারীরা বলছেন, শুধু ভারি বৃষ্টি হলেই আমাদের নিয়ে যায়। পরে আর খবর থাকে না। তাদের অভিযোগ, পাহাড়ের পাদদেশে ঘর নির্মাণের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তারাই পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করে নিম্ন আয়ের লোকজনকে কম ভাড়ার কথা বলে বসবাসের প্ররোচনা দেন। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। শুধু বর্ষা এলেই বসতি উচ্ছেদ করে।

পাহাড় ধসে প্রাণহানির যত ঘটনা
প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। নষ্ট হয় সম্পদ। পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ২০০৭ সালে। সে বছরের ১১ জুন টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে মারা যায় ৩০ জন। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বৃষ্টির সময় নগরের বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড় ধসে তিনজন নিহত হয়। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে মা-মেয়ে মারা যায়। সর্বশেষ শনিবার দিবাগত রাতে ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২ জন। 

সমস্যা দূর হচ্ছে না যেসব কারণে
অসহায় ও গরিব মানুষদের কাছ থেকে নামমাত্র টাকা নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসের সুযোগ করে দিচ্ছে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি। প্রশাসন প্রতিবছর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণ করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এইসব মূল হোতা 'পাহাড়খেকোরা'।



সমন্বয় নেই সরকারি সংস্থায়
পাহাড় রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে পাহাড়-ব্যবসার মূল হোতারা। আর পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরী বলেন, 'সরকারি কয়েকটি দপ্তরের আন্তরিকতার অভাবে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী বাসিন্দাদের সরানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বেশিরভাগ পাহাড়ের মালিক রেলওয়ে, গণপূর্ত-গৃহায়ন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু মালিকানাধীন পাহাড়ের ব্যাপারে সংস্থাগুলো উদাসীন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের মালিকানার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোই সে সবের সার্বিক তদারকি করবেন। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সংস্থাগুলোর কোনো কার্যক্রমই নেই।'

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরীর মতে, সরকারি সংস্থাগুলো নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলে এ সমস্যা দূর হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রশাসন কখনও পাহাড়ে বসতি স্থাপনের মূল হোতাদের চিহ্নিত করেনি। যারা বসতি স্থাপন করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বছরব্যাপী কর্মসূচি থাকে। পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের সরাতে আমরা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। এরপরেও তারা সেখানে থাকছে। এবার আমরা কঠোর হবো।

তিনি বলেন, স্থায়ী পুনর্বাসন না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণে কারা আছেন, তা সবাই জানে। এজন্য জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব মনে করে এগিয়ে আসতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য সাড়ে ছয় হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের একটি প্রকল্প রয়েছে বলেও জেলা প্রশাসক জানান।'

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://dailyvorerpata.com/ad/apon.jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]