শুক্রবার ২ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

শিরোনাম: ড. কামাল হোসেন রাজনীতির রহস্য পুরুষ: কাদের    দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ঋণের বোঝা বেড়েছে ৩৫ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক    নভেম্বরে ১৩৪ কোটি টাকার চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য জব্দ    রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ১৩ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত    নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দোকানে কাভার্ডভ্যান, বাবা-ছেলেসহ নিহত ৫    দৈনিক মৃত্যুতে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, সংক্রমণে জাপান    পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র শান্তি বজায় রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
সার খেকো পোটন!
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২২, ৭:২৮ পিএম আপডেট: ১৯.১০.২০২২ ৭:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

সরকারকে ফাঁকি দিয়ে নরসিংদী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটন বিপুল পরিমাণ সার খোলাবাজারে বিক্রি করে নিজের রামরাজত্ব চালাচ্ছেন।
জাহাজ থেকে খালাস হলেও সরকারি গুদামে পৌঁছেনি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আমদানি করা ৭২ হাজার ৬৮০ টন ইউরিয়া। প্রায় ৫০৮ কোটি টাকার এই সার সরিয়ে নিয়েছে পরিবহন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নরসিংদী-২ আসনের সাবেক এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটন।

দশম জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র এমপি কামরুল আশরাফ খান পোটন দেশের সার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি। বহু বছর ধরে তিনিসহ হাতেগোনা কয়েকজনের কাছে জিম্মি হয়ে আছে সার ব্যবসা। আমদানি করা সার বন্দর থেকে সরকারি গুদামে সরবরাহে পরিবহন ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণও রয়েছে তাদের হাতেই।

জানা যায়, বিদেশ থেকে জাহাজে করে ব্যাগড ইউরিয়া সার আনার পর বন্দর থেকে সরাসরি গুদামে নিয়ে যাওয়া হয়। আর আমদানি করা বাল্ক ইউরিয়া নেওয়া হয় বিভিন্ন সার কারখানায়। দুই ক্ষেত্রেই সার স্থানান্তরের দায়িত্ব পরিবহন ঠিকাদারের। স্থানীয় পরিবহন চুক্তির ৪(বি) ধারা অনুযায়ী ডেলিভারি চালান ইস্যুর পর ৫০ দিনের মধ্যে বাল্ক ইউরিয়া ও ৪০ দিনের মধ্যে ব্যাগড ইউরিয়া সার সংশ্লিষ্ট গুদাম বা কারখানায় সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে পোটন ট্রেডার্স বিসিআইসির বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত এবং আমদানি করা সার পরিবহনে ঠিকাদারির কাজ করে আসছে। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে এ বছর মে মাস পর্যন্ত মোট ৮টি চালানে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯০০ টন সার পরিবহনের দায়িত্ব পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিটি চালানেই জাহাজ থেকে নামানো পরিমাণের তুলনায় গুদামে পৌঁছেছে ২৯ শতাংশ কম সার। সব মিলিয়ে ৭২ হাজার ৬৮০ টন সার কম পেয়েছে সরকার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০৮ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের ২০ নভেম্বর জাহাজ থেকে ৩১ হাজার ৭৪১ টন সার খালাস করে ২৭ হাজার ৬৩৩ টন গুদামে সরবরাহ করে পোটন ট্রেডার্স। বাকি ৪ হাজার ১০৮ টন সারের হদিস নেই। একই বছরের ২৭ নভেম্বর ৩৩ হাজার টন খালাস করে ২২ হাজার ১৫২ টন সার সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ১০ হাজার ৮৪৮ টনের হদিস মেলেনি। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি ২৮ হাজার ৮৯১ টন খালাসের পর গুদামে সার দিয়েছে ১৯ হাজার ৯১ টন। বাকি ৯ হাজার ৮০০ টন সার দেওয়া হয়নি। ১২ জানুয়ারি খালাস করা সারের মধ্যে ২৮ টন সরবরাহ করা হয়নি। ২৬ জানুয়ারি ৩৩ হাজার টন সার জাহাজ থেকে খালাসের পর মাত্র ১৩ হাজার ৯৬৬ টন সরবরাহ করা হয়। বাকি ১৯ হাজার ৩৪ টন সরিয়ে নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২৯ হাজার ৮৬৭ টন সার খালাস হলেও পোটন ট্রেডার্স ৩ হাজার ৬৪৯ টন সার কম সরবরাহ করে। সর্বশেষ ১৫ মে ২৯ হাজার ৮২৮ টন সার খালাসের পর বিসিআইসির গুদামে সরবরাহ করে ১৭ হাজার ৬৮৯ টন। বাকি ১২ হাজার ১৩৯ টন সরবরাহ করেনি পোটন ট্রেডার্স।

বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও বিপুল পরিমাণ এই সার বিসিআইসির গুদামে সরবরাহ করেনি পোটন ট্রেডার্স। দেশে সার সংকটের আশঙ্কা করে দ্রুত পাওনা সার গুদামে পৌঁছানোর তাগিদ দিয়ে ১৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে বিসিআইসি। এতে বলা হয়, ‘বর্তমানে মিনি পিক সিজন চলছে। গুদামগুলোতে দ্রুত সার পরিবহন করা সম্ভব না হলে মজুত কমে সারের সংকট হতে পারে। অধিকাংশ গুদামে সারের মজুত কমে গেছে। সব গুদামে সার গ্রহণের পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। এ ছাড়া বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ বাফার গুদামের খালি জায়গা সার দিয়ে পূর্ণ করার নির্দেশনা দিয়েছে; কিন্তু পোটন ট্রেডার্সকে বারবার দ্রুত সার সরবরাহের জন্য বলা হলেও বাফার গুদামগুলোতে সার সরবরাহ সন্তোষজনক নয়।’ এ অবস্থায় অতিদ্রুত ৭২ হাজার ৬৮০ টন সার সরবরাহ করে চলমান মিনি পিক সিজনে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইউরিয়া সারের সাপ্লাই চেইন চলমান রাখতে অনুরোধ জানানো হয়।

তবে ছয় মাস থেকে এক বছর আগের চালানের এসব সারের আর কোনো অস্তিত্ব নেই বলেই মনে করেন বিসিআইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, সরকারের কেনা এসব সার পরিবহন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। সঠিক তদন্ত হলে সহজেই সার আত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে আসবে বলেও তারা মনে করেন।

বিসিআইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, গুদামে সারের মজুত কমে গেছে। যে কোনো সময় সংকট দেখা পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাগিদ দিয়ে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও পরিবহন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্স সার সরবরাহ করছে না। তারা বিষয়টিতে গুরুত্বও দিচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, এসব সার তাদের হাতে নেই। সারগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।

তবে সার আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে পোটন ট্রেডার্সের মহাব্যবস্থাপক শাহাদাত হোসেন নিপু বলেন, ‘আমরা নিয়মিতভাবেই সার সরবরাহ করছি। গুদামগুলোয় জায়গা নেই বলে সার দিতে দেরি হচ্ছে।’



কিন্তু তার এমন দাবি নাকচ করে বিসিআইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই বাফার গুদামগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে সারের মজুত কম আছে। গুদামে সার রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে। আগের চালানের সারগুলো আত্মসাৎ করার কারণে পোটন ট্রেডার্স তা সরবরাহ করছে না বলে তারা মনে করেন। ওই কর্মকর্তারা বলেন, মিনি পিক সিজনের পরই পিক সিজন চলে আসবে। কিন্তু বাফার গুদামে মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ কঠিন হতে পারে। সাপ্লাই চেইনে জোগান ঘাটতি হলে সংকট তৈরি হবে। আর তাতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় পোটন ট্রেডার্সের কাছে পাওনা ৭২ হাজার ৬৮০ টন সার দ্রুত আদায়ের চেষ্টা করছে বিসিআইসি; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সার দিচ্ছে না।

এদিকে বিপুল পরিমাণ সার আত্মসাতের পাশাপাশি পোটন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে সরকার গুদামে নিম্নমানের সার সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। গত রোববার প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া বিসিআইসির আরেক চিঠিতে বলা হয়, ‘বিভিন্ন কারখানা ও বাফার গুদামের তথ্যানুযায়ী গত শনিবার পর্যন্ত আপনার প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭২ হাজার ৬৮০ টন ইউরিয়া সার পাইপলাইন বা ট্রানজিটে রয়েছে। সম্প্রতি আপনার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বাফার গুদামে শক্ত, জমাটবাঁধা, বিবর্ণ, কালো ও ময়লাযুক্ত সার সরবরাহ করছে। গাইবান্ধা বাফার গুদামে শক্ত, জমাটবাঁধা, বিবর্ণ, কালো ও ময়লাযুক্ত সরবরাহ অনুপযোগী সার পাঠানো হয়েছে। আপনার প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা সার প্রয়োজনে রি-ব্যাগিং বা ব্যবহার উপযোগী করে জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট গুদামে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করছি। ধীরে ধীরে সব সারই দিয়ে দেব।’ শক্ত, জমাটবাঁধা, বিবর্ণ, কালো ও ময়লাযুক্ত সার সরবরাহের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, কয়েক বস্তা সারে এমন সমস্যা ছিল।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিআইসি চেয়ারম্যান শাহ মো. ইমদাদুল হক বলেন, প্রতিষ্ঠানটি অল্প অল্প করে সার দিচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। সরকারের প্রাপ্য সার গুদামে না পৌঁছালে প্রতিষ্ঠানটির নামে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেটি আমি বলতে পারব না। এটা সরকারের সিদ্ধান্ত।’

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/dd.jpg
http://dailyvorerpata.com/ad/apon.jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]