
সংগৃহীত ছবি
একসময় ছক্কা হাঁকানোকে বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতেন ব্যাটসম্যানরা। সাধারণত ইনিংসের শেষ ওভারগুলোতেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেন তাঁরা। কিন্তু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। প্রথম ওভার থেকেই শুরু হচ্ছে ছক্কার বৃষ্টি। ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের চলমান সিরিজ তারই প্রমাণ। চার ম্যাচেই দুই দলের ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ৯৮টি ছক্কা। শেষ ম্যাচের আগে হাতছানি দিচ্ছে বিশ্বরেকর্ড। বেঙ্গালুরুতে আরও ২৩টি ছক্কা হলেই দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে সর্বোচ্চ ছক্কার নতুন রেকর্ড গড়বে দুই দল।
পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ইতিমধ্যে চারটি ম্যাচ খেলেছে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিকেট পরিসংখ্যান সংস্থা ক্রিকভিজের তথ্য অনুযায়ী, এই চার ম্যাচে দুই দল মিলে করেছে ১ হাজার ৬৬১ রান। এর মধ্যে চার ও ছক্কা থেকেই এসেছে ১ হাজার ১৯৬ রান। শুধু ছক্কা থেকেই এসেছে ৫৮৮ রান, যা মোট রানের ৩৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ রানের মধ্যে ৩৫ রানেরও বেশি এসেছে ছক্কায়।
দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডটি এখন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দখলে। ২০২৩ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে দুই দল মিলে ১২০টি ছক্কা মেরেছিল। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের ছক্কা ছিল ৬৪টি, ইংল্যান্ডের ৫৬টি। পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে এখন পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ।
শনিবার বেঙ্গালুরুতে সিরিজের শেষ ম্যাচে সেই রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে। ২২টি ছক্কা হলে আগের রেকর্ড স্পর্শ করবে তারা। আর ২৩টি ছক্কা হলেই তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।
ছক্কার লড়াইয়ে চলতি সিরিজে এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চার ম্যাচে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ৫৭টি ছক্কা, ভারতের ব্যাটসম্যানদের ছক্কা ৪১টি। তবে চার মারার ক্ষেত্রে এগিয়ে ভারত। স্বাগতিকদের ব্যাট থেকে এসেছে ৮৩টি চার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৬৯টি।
দুই দলের ব্যাটিং কৌশলেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা মাঠের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে চার মারার পাশাপাশি ছক্কাও হাঁকাচ্ছেন। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের ঝোঁক বল সীমানার বাইরে পাঠানোর দিকে।
পরিসংখ্যানেও সেই পার্থক্য উঠে এসেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মোট রানের ৪০ দশমিক ৮১ শতাংশ এসেছে ছক্কা থেকে। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
শুধু ছক্কার সংখ্যা নয়, ইনিংসের কোন পর্যায়ে সেগুলো এসেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাওয়ার প্লেতে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ১৪টি ছক্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা ১০টি। তবে মাঝের ওভারগুলোতে চিত্র বদলে যায়। এই সময়ে ক্যারিবীয়রা ২৭টি ছক্কা মারলেও ভারতের ব্যাটসম্যানদের ছক্কা ১৬টি।
শেষের ওভারগুলোতেও এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ডেথ ওভারে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ২০টি ছক্কা, ভারতের ব্যাটসম্যানরা ১১টি। অর্থাৎ পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মোট ছক্কার বড় অংশ এসেছে।
এই ছক্কা উৎসবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন শাই হোপ। সাধারণত ইনিংস গড়ে খেলার জন্য পরিচিত এই ব্যাটসম্যানও টি-টোয়েন্টিতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। চলতি সিরিজে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ২০টি ছক্কা। সতীর্থ শেরফান রাদারফোর্ড মেরেছেন ১৫টি।
হোপ ও রাদারফোর্ড মিলে হাঁকিয়েছেন ৩৫টি ছক্কা। ভারতের পুরো দলের ছক্কার সংখ্যার চেয়ে মাত্র ছয়টি কম।
ভারতের হয়ে অবশ্য কোনো একক ব্যাটসম্যান ছক্কা মারায় বড় ব্যবধানে এগিয়ে নেই। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৯টি ছক্কা মেরেছেন অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার। সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মার ছক্কা আটটি করে।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ভারত সফরে দারুণ ছন্দে রয়েছেন হোপ। পাঁচটি ইনিংসে পঞ্চাশের বেশি রান করেছেন তিনি, যার চারটিই সেঞ্চুরি। এর মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে রয়েছে দুটি সেঞ্চুরি। তাঁর মতো ধীরস্থির ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত একজন ক্রিকেটারের এমন পরিবর্তন আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটসম্যানদের বদলে যাওয়া মানসিকতারই ইঙ্গিত দেয়।
সর্বশেষ হায়দরাবাদে চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে হোপের অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংসে ভর করে আগে ব্যাট করে ৩ উইকেটে ২৪৭ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বড় লক্ষ্য তাড়া করার চাপ না থাকলেও ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ২৪ রানে ম্যাচ জিতে সিরিজে ২-২ সমতা ফেরায় দলটি।
ব্যাটসম্যানদের এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে বোলারদের। এখন শুধু খারাপ বলই সীমানার বাইরে যাচ্ছে না; ভালো জায়গায় বল করেও ছক্কা হজম করতে হচ্ছে তাঁদের। চলতি সিরিজে ভারতের অক্ষর প্যাটেল সর্বোচ্চ ১৪টি ছক্কা দিয়েছেন। নামান ধীরের বল থেকেও এসেছে ১২টি ছক্কা। উইকেট পেলেও ছক্কার বন্যা ঠেকাতে পারেননি তাঁরা।
তবে বেশি ছক্কা মারলেই যে জয় নিশ্চিত, তা নয়। ম্যাচের পরিস্থিতি, উইকেটের ধরন, ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্য ও দুই দলের কৌশলের ওপর ফলাফল নির্ভর করে। তারপরও ভারত–ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই সিরিজ দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে ছক্কা আর শুধু বিশেষ মুহূর্তের আক্রমণ নয়; এটি এখন নিয়মিত রান তোলার অন্যতম প্রধান অস্ত্র।