
সংগৃহীত ছবি
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে দেশের পূজামণ্ডপগুলো। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে অধিকাংশ মণ্ডপের প্রস্তুতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর থেকেই দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা। গত কয়েক দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন আয়োজকরা। অধিকাংশ মণ্ডপে প্রস্তুতির কাজ শেষ হলেও কোথাও কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা ও দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা তৈরির কাজ।
আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সকালে ষষ্ঠীপূজা এবং সন্ধ্যায় দেবী দুর্গার বোধন অনুষ্ঠিত হবে। বোধন অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্তি।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, শরৎকালের দুর্গাপূজায় দেবীর বোধন করা হয়। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাবণবধের উদ্দেশ্যে ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। অসময়ে এই পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় তা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, বসন্তকালের দুর্গাপূজায় বোধনের বিধান নেই।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন।
তিথির কারণে এবার দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা ছয় দিন ধরে চলবে। মহাসপ্তমীর পূজা শনিবার ও রবিবার দুদিন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সোমবার মহাষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীদর্শন, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে।
দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও প্রতিমায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পূজার প্রস্তুতি এবং হামলা-ভাঙচুরের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও কাজল দেবনাথ এবং সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মাসহ অন্যরা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পূজার আগে দেশের ৩৪টি স্থানে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় করা ১১টি মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় দুর্গাপ্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও জানানো হয়।
এ ছাড়া ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরি, সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ এবং নওগাঁয় ডাকাতির খবর তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং পূজামণ্ডপগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে।
ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সব ধর্মীয় উৎসব যেন মানুষ ভয়ভীতি ছাড়াই উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
দুর্গাপূজা ঘিরে বিপণিবিতান ও স্থানীয় বাজারগুলোতেও বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনছেন ক্রেতারা। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে উৎসব উদযাপনের পরিকল্পনা করছেন অনেকে।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দুর্গোৎসব বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সামাজিক মিলনমেলার অন্যতম উপলক্ষ। দীর্ঘ ছুটির কারণে এবার উৎসবে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি। সে হিসাবে এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি।
তবে ঢাকা মহানগরে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত বছর মহানগরে ২৬১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার হবে ২৫৮টি মণ্ডপে।
পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন, সম্ভব হলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা আয়োজক ও ভক্তদের।