
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের স্মরণে তিন দিনব্যাপী ইলা মিত্র মেলা শুরু হয়েছে। রোববার বিকেল সাড়ে তিনটায় নাচোল ডাকবাংলো মাঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। ইলা মিত্রের মৃত্যুবার্ষিকী ১৩ অক্টোবর ও জন্মবার্ষিকী ১৮ অক্টোবর সামনে রেখে ইলা মিত্র মেলা জাতীয় কমিটি এ আয়োজন করেছে।
মেলা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইলা মিত্র মেলা জাতীয় কমিটির চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব ইসরাইল সেন্টু। এতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহিল কাফি রতন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড ও বিপ্লবী গণফ্রন্টের রাজশাহী সভাপতি লিটু বিশ্বাসসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষে মা সাজেদা রহমান ও ছেলে মৃদঙ্গ রহমান পরিবেশনায় অংশ নেন। পরে অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির বাণী পড়ে শোনান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও মেলা কমিটির সদস্য আব্দুল্লাহিল কাফি রতন।
নাচোলের ‘রাণী মা’ থেকে ইতিহাসের কিংবদন্তি ইলা মিত্র।।
শোষিত কৃষক ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিস্মরণীয় এক নাম ইলা মিত্র। জমিদার ও জোতদারদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কৃষকের ন্যায্য হিস্যার দাবিতে গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এ অঞ্চলের মানুষের আপনজন। কৃষক ও সাঁওতালদের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘রাণী মা’ হিসেবে।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার, কারাবাস ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অবিচল ছিলেন তিনি। তাঁর এই সংগ্রামী জীবন তাঁকে উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার বাগুটিয়া গ্রামে। ১৯৪৫ সালে তিনি বিয়ে করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রমেন্দ্রনাথ মিত্রকে, যিনি রমেন মিত্র নামেও পরিচিত ছিলেন। রমেন মিত্র ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ও কৃষক আন্দোলনের সংগঠক।
বিয়ের পর ইলা মিত্র স্বামীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষ্ণগোবিন্দপুরে চলে আসেন। পরে তিনি ওই এলাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। রমেন মিত্রের পরিবার স্থানীয় প্রভাবশালী ভূস্বামী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হলেও ইলা মিত্র শোষিত ও বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শ ও সহযোগিতা তাঁর এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কৃষকদের বড় একটি অংশ জমির মালিক না হয়েও জমি চাষ করতেন। উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ জমির মালিকদের দিয়ে দিতে হতো তাঁদের। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষকের প্রাপ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলেও এ আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।
নাচোলের দরিদ্র কৃষক ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইলা মিত্র। তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা এবং শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে তিনি সক্রিয় ছিলেন। কৃষকদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে তিনি তাঁদের আস্থা অর্জন করেন। এ কারণেই স্থানীয় কৃষক ও সাঁওতালদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘রাণী মা’।
তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল ফসলের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। জমিদারি শোষণ, সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করাও ছিল তাঁর সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য। স্বামী রমেন মিত্রসহ সমমনা রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা এ আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে নাচোলের কৃষক আন্দোলন সংঘাতের রূপ নেয়। ৫ জানুয়ারি চাঁদিপুর এলাকায় পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ওই অঞ্চলে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। বহু কৃষক ও সাঁওতাল নির্যাতনের শিকার হন। অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অসংখ্য মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
ইলা মিত্রের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে সেই সময়ের নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা। তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রহনপুর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন নাচোল থানা হেডকোয়ার্টারে নেওয়ার পথে পাহারায় থাকা পুলিশ সদস্যরা তাঁর ওপর নির্যাতন চালান বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, নাচোল থানায় নেওয়ার পর তাঁকে একটি সেলে আটকে রাখা হয়। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে ভয়ভীতি দেখান। স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় তাঁর পোশাক খুলে নেওয়া হয় এবং তাঁকে আটকে রেখে খাবার ও পানি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইলা মিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পুলিশ সদস্যরা তাঁর মাথায় বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করেন। পরে রাতে তাঁকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। জবানবন্দিতে তিনি নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতির বিবরণ দেন। নির্যাতনের ফলে একপর্যায়ে তাঁর হাঁটার সক্ষমতাও হারিয়ে যায় বলে জানান তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরদিনও তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধর্ষণের হুমকি দেন। পরে রাতে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধর্ষণ করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নির্যাতনের একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন ইলা মিত্র।
কৃষক বিদ্রোহের ঘটনায় ইলা মিত্রের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিচার শেষে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। তাঁর মুক্তির দাবিতে রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সোচ্চার হন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ অনেকেই তাঁর মুক্তির দাবি জানান।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ওই বছরের জুনে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেননি। কলকাতায় গিয়ে আবারও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
ভারতে ফিরে যাওয়ার পরও ইলা মিত্রের রাজনৈতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসেবে একাধিকবার নির্বাচিত হন এবং বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক আন্দোলনের পাশাপাশি নারী অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমানুষের নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর জীবনসংগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার কৃষক আন্দোলন, নারী জাগরণ ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়ার প্রায় ৪২ বছর পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে আসেন ইলা মিত্র। তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই বছরের ৪ নভেম্বর ঢাকায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরে ৬ নভেম্বর রাজশাহীর ভূবন মোহন পার্ক এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল কলেজ মাঠে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
নাচোলে তাঁর আগমনকে ঘিরে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ তাঁদের প্রিয় ‘রাণী মা’কে দেখতে সমবেত হন। যে অঞ্চলের কৃষক ও সাঁওতালদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর ফিরে আসা ছিল স্মৃতিবিজড়িত এক বিশেষ মুহূর্ত।
২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ইলা মিত্র। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটলেও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে তাঁর সংগ্রাম আজও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
ইলা মিত্রের জীবন কেবল একজন রাজনীতিকের জীবনকাহিনি নয়। এটি কৃষকের অধিকার, নারী জাগরণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের মাটিতে তাঁর যে পরিচয় গড়ে উঠেছিল, ‘রাণী মা’ সেই পরিচয় আজও এ অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে আয়োজিত ইলা মিত্র মেলা নতুন প্রজন্মের কাছে এই সংগ্রামী ইতিহাস তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।