
সংগৃহীত ছবি
টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হওয়া উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করেননি এবং কোনো মুচলেকাও দেননি। সুস্থ হয়ে আবারও দায়িত্ব পালন করতে চান তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হোয়াটসঅ্যাপে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এসব কথা বলেন উপাচার্য।
দায়িত্ব গ্রহণের ১৭ দিন পর গত সোমবার সকালে প্রথমবারের মতো চুয়েট ক্যাম্পাসে নিজ কার্যালয়ে যান অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। এ সময় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁর কার্যালয়ের নিচে অবস্থান নেন।
পরে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা দেন। এতে উপাচার্যসহ মোট ১২ জন সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে উপাচার্য জানান, তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করছেন এবং প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন। পরে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সহায়তায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন তিনি।
উপাচার্য ভবন থেকে বের হওয়ার সময় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, উপাচার্যকে আর কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার শর্তে বের হতে দেওয়া হচ্ছে। এরপর পুলিশি প্রহরায় গাড়িতে ওঠেন শেখ শরীফুল আলম। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। পরে মঙ্গলবার রাতে পুলিশি প্রহরায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বুধবার সকালে শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, আগের দিনের তুলনায় তিনি কিছুটা ভালো আছেন। তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিক রয়েছে, মাথাব্যথা ও বুকে ব্যথাও কমেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসা চলবে।
ক্যাম্পাস ছাড়ার বিষয়ে শেখ শরীফুল আলম বলেন, সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁদের। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর পদত্যাগ এবং ভবিষ্যতে আর কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ছেড়ে দিয়েছেন বলে যে খবর প্রচার করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি তিনি দেননি।
উপাচার্যের ভাষ্য, তাঁকে যখন ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হচ্ছিল, তখন অসুস্থতার কারণে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। অসুস্থতার কারণেই তাঁকে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে। এখনো তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। সুস্থ হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিজের বক্তব্য না নিয়েই এ ধরনের ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য’ প্রকাশ করাকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেন শেখ শরীফুল আলম।
কবে নাগাদ ক্যাম্পাসে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থ, বিশেষ কোনো এজেন্ডা কিংবা দলীয় উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি চুয়েটে আসেননি। রাষ্ট্র তাঁকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করতেই চট্টগ্রামে এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সচল রাখা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে জানিয়ে উপাচার্য বলেন, তিনি নিজেও চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি তাঁর আবেগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাঁকে এক দিনও দেখেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছয় মাস দায়িত্ব পালনের পর তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, ব্যর্থতা বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকত। তাঁর ধারণা, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।
শেখ শরীফুল আলম আরও বলেন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) তিনি উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক বিষয় পাওয়া যায়নি। সবকিছু ইতিবাচক বিবেচনা করেই সরকার তাঁকে চুয়েটে দায়িত্ব দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সুস্থ হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে চুয়েটের বিষয়ে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন উপাচার্য।
উল্লেখ্য, চুয়েটে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। একই দিন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন শিক্ষার্থীরা।
পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে আসছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
এ পরিস্থিতিতে চুয়েটের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে।