
সংগৃহীত ছবি
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের আসনসংখ্যা ৫৩। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে রেকর্ড ১৯টি আসন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ, যা দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে ইসরায়েলকে আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। নেতানিয়াহু সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আসনসংখ্যার হিসাবে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সামনে সেই সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, তাদের ৪৮ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যোগ করলে মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমীকরণ বাস্তবায়ন সহজ নয়।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর রেকর্ডসংখ্যক আসন ইসরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মহলের একটি অংশ তাদের ক্ষমতার বলয়ের বাইরে রাখতে চায়। নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান দুজনই আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলেও ইসরায়েলের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোটও ইরান ও হামাসের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী তিনি। নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর প্রধান মতপার্থক্য মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নিয়ে।
ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, পানিব্যবস্থাপনা, মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে।
তবে ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হলে দুই দেশের সম্পর্কের ধরন কিংবা কূটনৈতিক ভাষায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে ইসরায়েল। পাশাপাশি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে ওঠা আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে নতুন সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদ্যমান সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ থাকবে।
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভারতের জন্য কূটনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ইরানের সঙ্গেও দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে আরব দেশগুলো ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও সংকটের সমাধান নিয়ে ভারতের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।