
সংগৃহীত ছবি
স্মার্টফোনে ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ সামনে এল ৩০ সেকেন্ডের একটি রিলস। ভিডিওতে এক ইনফ্লুয়েন্সার বলছেন, ‘ইফ দে ওয়ান্টেড টু, দে উড হ্যাভ’ কিংবা ‘হাউ আ হাই-ভ্যালু পার্টনার শুড ট্রিট ইউ’। এমন কথা শুনে অনেকেই নিজের সঙ্গী বা জীবনসঙ্গীর আচরণের সঙ্গে ভিডিওর বক্তব্য মেলাতে শুরু করেন। এরপর সম্পর্ক নিয়ে শুরু হয় নানা হিসাব-নিকাশ ও আত্মবিশ্লেষণ।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এসব ছোট ভিডিও কিংবা জমকালো সারপ্রাইজের দৃশ্য কি বাস্তব সম্পর্কের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে? নাকি অজান্তেই সঙ্গীর প্রতি সন্দেহ, অবাস্তব প্রত্যাশা ও ভুল বোঝাবুঝি বাড়িয়ে তোলে?
ভারতের একটি জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, সম্পর্কবিষয়ক রিলস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পরামর্শ ব্যক্তিগত জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলছে। শহর ও মফস্বলের ২২ থেকে ৩৮ বছর বয়সী প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় উঠে এসেছে সম্পর্কের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত পরিসর এবং অনলাইন কনটেন্টের প্রভাবের নানা দিক।
মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি যেভাবে তুলে ধরা হয়, বাস্তব জীবন সব সময় তেমন হয় না। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৫ বছরের বেশি বয়সী ৪ হাজার ৬৯৪ জন উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসে দেখানো নিয়ম প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে প্রয়োগ করলে জটিলতা বাড়তে পারে।
মনোবিদদের মতে, প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব প্রেক্ষাপট, অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়া রয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভিডিও দেখে সঙ্গীর একটি মিসড কলকেই ‘ইমোশনাল নেগলেক্ট’ বা মানসিক অবহেলা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বরং সঙ্গীর পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা ও বাস্তবতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কর্মব্যস্ত দিন শেষে অনেকেই কিছুটা সময় একা কাটাতে কিংবা নিজের মতো থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ পুরুষের অভিযোগ, কাজের পর ব্যক্তিগত সময় বা ‘স্পেস’ চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ট্রেন্ডের প্রভাবে তাঁদের ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেইলেবল’ বা আবেগগতভাবে অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
একইভাবে, ৩৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, সম্পর্কে বড় কোনো সারপ্রাইজ দেওয়া কিংবা জমকালো ডেটের আয়োজন করতে না পারলেই সঙ্গীর ভালোবাসা বা আন্তরিকতার অভাব রয়েছে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়। সম্পর্কের যত্ন সব সময় ব্যয়বহুল উপহার কিংবা চোখধাঁধানো আয়োজনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩ হাজার ৩৪৭ জনের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কবিষয়ক অনেক কনটেন্ট ভিউ ও অনুসারী বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। অনেক সময় একটি দৃশ্য নিখুঁতভাবে উপস্থাপনের জন্য একাধিকবার ধারণ করা হয়। ফলে সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, মান-অভিমান কিংবা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলো এসব ভিডিওতে খুব কমই দেখা যায়।
এরপরও অনেকে অনলাইনের সাজানো মুহূর্তগুলোর সঙ্গে নিজের স্বাভাবিক জীবনকে তুলনা করেন। ফলে শান্ত, স্বাভাবিক ও গভীর ভালোবাসার প্রকাশও তাঁদের কাছে কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানো সম্পর্কের নিখুঁত চিত্র বাস্তব জীবনের প্রতি প্রত্যাশা বদলে দিতে পারে।
সম্পর্কবিষয়ক সব কনটেন্টই যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা নয়। সমীক্ষায় প্রায় ৪৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, রিলস তাঁদের সুস্থ সম্পর্কের সীমারেখা বা ‘বাউন্ডারি’ নির্ধারণ সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করেছে।
বিশেষ করে ত্রিশের কোঠায় থাকা ২৭ শতাংশ নারী স্বীকার করেছেন, ভালো ও গঠনমূলক রিলস কখনো কখনো সম্পর্ক নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, সচেতনভাবে বেছে নেওয়া উপকারী কনটেন্ট সম্পর্কের পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পরবর্তী সময়ে সঙ্গীকে কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ রিলস পাঠানোর আগে একটু ভেবে দেখুন—সমস্যাটি কি সত্যিই সঙ্গীর আচরণে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট আপনার প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করছে?
মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখে সঙ্গীকে বিচার না করে তাঁর সঙ্গে সরাসরি ও খোলামেলা কথা বলুন। সম্পর্কের এই মুহূর্তে আপনার প্রয়োজন মনোযোগ, স্পষ্ট যোগাযোগ, নাকি পারস্পরিক আশ্বাস—তা বোঝার চেষ্টা করুন।
মনে রাখা জরুরি, প্রতিটি সম্পর্ক আলাদা। অন্য কারও সম্পর্কের নিয়ম নিজের জীবনে হুবহু প্রয়োগ না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে সুস্থ সম্পর্কের চাবিকাঠি।