
সংগৃহীত ছবি
মাধবী-২৬১
মোঃ আসাদুজ্জামান
রাজনৈতিক কর্মী।
১১ অক্টোবর, ২০২৬।
মাধবী,
প্লেনে উঠেই একটা ঘুম দিলাম, ঘুম ভেঙে দেখি ক্যাবিন অন্ধকার, আশপাশের সীটের সবাই ঘুমে, কারও সামনে টিভি চললেও কেউ দেখছে বলে মনে হলো না। এমন আঁধার ঘেরা পরিবেশ ভালোই লাগছে। ওয়াইফাই কানেকশন নিলাম, দেখি এক এক করে সকল সোস্যাল মিডিয়ার তথ্য ইনবক্স হচ্ছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার আত্মজা কথার ফোন এলো, কথা বলে রাখলাম। মেয়েটা ছুটিতে এসেছে, ওকে রেখেই আমি তুরস্ক চলে এসেছি, এটা বড্ড অন্যায়, তারপরও কিছু করার ছিলো না, ব্যস্ত বাবা-মায়েদের সন্তানেরা এভাবেই মেনে নেয়, মানিয়ে নেয়। কথা’র সাথে কথা শেষ করে ইউটিউবে গান শুনতে মন চাইলো, সাথে সাথে ইউটিউব খুলতেই এলগরিদমের কল্যানে সামনে ভেসে এলো গৌতম ঘোষালের কন্ঠে, ‘আঁধার আমার ভালোলাগে, তারা দিয়ে লাজিও না আমার আকাশ, আঁধার আমার ভালো লাগে..’! মুকুল দত্তের লেখা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে, প্রতিমা ব্যানার্জি গানটি প্রথম গেয়েছিলেন। তবে, গৌতম ঘোষালের কন্ঠে এই গানটি শুনতে আমার বেশ লাগে। আমার মতো অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুনো, দেখবে বেশ লাগছে। বিশেষ করে, নিচের ক’টি লাইন-
রাতের গভীরে আজ, বঁধুয়ার পরশে হাজার প্রদীপ
যদি জ্বলে, বঁধুয়ার পরশেতে জ্বলে যাবে এই রাত
রবে অনুরাগে ভালোবাসাতে !! সাজিওনা আমার আকাশ, যেন তারায় তারায় , ভালো লাগে তাইতো এ আঁধার, আঁধার আমার ভালো লাগে!’
মাধবী,
গানটি শুনতে শুনতে কখন যে বুকের গভীরতম গিরি পথ দিয়ে ইস্তাম্বুলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বসফরাস নদীর মতো তোমার উপস্থিতি বয়ে গেলে তা বুঝতে পারিনি। সম্বিত ফিরতেই ঐ গানের কথাগুলোর মতো মনে হলো, তোমার জন্য বেলা অবেলায়, সারাবেলায়, তনুতটি সাজিয়ে আগুন হয়ে বসে থাকি, বসে থাকি উতলা এ মন নিয়ে, মনে হলো ‘জানি না তো বঁধুয়া মরণ রয়েছে লেখা, ভালোবেসে আজ এ রাতে!’ সে যাইহোক, আমার যাই হয়ে যাক না কেন, তুমি অন্যকোথাও, অন্য কারও জন্য সবটুকু নিয়ে ভোরের আকাশ দেখো, পূবের হাওয়া মেখো, সাজিওনা আমার আকাশ যেন তারায় তারায়, আমার ভালো লাগে জ্বলে যেতে সেই বিষের জ্বালায়, ভালোলাগে এই আঁধার, তারা দিয়ে সাজিও না আমার আকাশ !
মাধবী,
আজ কিছু লিখতে চাইছিলাম না, বিশ্বাস করো, অভিমান নিয়ে লিখতে চাইনি। কিন্ত তোমার অন্ধভক্ত ডঃ মাহবুবুল হক রিপন, মালয়েশিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, প্লেনে উঠার আগে আমাকে অনুরোধ করেছিল তোমাকে লিখতে, তাই লিখলাম। এবারের তুরস্ক ভ্রমণ খুবই সংক্ষিপ্ত ছিলো। দুইদিনের প্রোগ্রাম। প্রায় সত্তরটি দেশের আইনমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এবারের সম্মেলনে তিনটি দেশের আইনমন্ত্রী প্লেনারী সেশনে বক্তৃতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তার মধ্যে বাংলাদেশের জনগনের পক্ষে আমি আমাদের কথা তুলে ধরতে পেরেছিলাম। কর্মসূচির দুইদিনই বিকেলের অধিবেশনে আমার তেমন কোন অংশগ্রহণের বিষয় না থাকায় স্থানীয় একজন বাঙালী গাইড নিয়ে প্রথমদিন ইস্তাম্বুল শহর থেকে প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার দূরে গ্রীস এবং বুলগেরিয়া বর্ডার দেখতে গেলাম। সেখানে ডিনার করার ইচ্ছে থাকলেও ইস্তাম্বুলে ফিরে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশগ্রহণ করার তাগিদে ফিরে আসলাম। শহরের কোলাহল পেরিয়ে ১৯০-২০০ কিলোমিটার গতিতে ড্রাইভার ভক্সওয়াগন চালিয়েছিলো, টের পাইনি প্রথমে। হঠাৎ স্পিড মিটারে চোখ যেতেই ড্রাইভারকে সতর্ক করলাম। পরেরদিন একই গতিতে গাড়ী চললো, সাথে ওয়ালিদ ভাই, সাজিদ করিমসহ আমার দু’জন বাংলাদেশী ছোটভাই। পুরনো দিনের গানের ডালিতে ভ্রমন হয়ে উঠেছিলো অপূর্ব আনন্দময় । গাড়ীতে উঠার পর গন্তব্য ঠিক করলাম তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ডিনার করতে যাবো। পাঁচশো কিলোমিটার দূরে, সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টার জার্নি। যেই কথা সেই কাজ, ছবির মতো সাজানো পাহাড়ের কোল ঘেঁসে বয়ে যাওয়া রাস্তা, পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুদীর্ঘ টানেল অতিক্রম করে ইস্তাম্বুল শহর থেকে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট একটি শহরে এসে দাঁড়ালাম, ছিমছাম, গোছালো শহর। এই শহরের নাম ‘বোলো’, সৌন্দর্যের ঝিলিক রূপকথার কোন সুন্দর শহরকে হার মানাবে এর সৌন্দর্য । সবাই মিলে একটু হাঁটলাম। কিছুটা শীতের আমেজ, কি যে ভালো লাগলো, কি যে ভালো লেগেছিলো মাধবী, যদি থাকতে, যদি জানতে, যদি দেখতে, তাহলে আমার এই ভ্রমন স্বার্থক হতো। এই শহরের মায়ায় পড়ে আর আঙ্কারা যাওয়া হলো না, এর পাশেই একটি হোটেলে নেটিভ তার্কিশদের হোমমেড খাবার খেলাম, তারপর মাঝরাতে ফিরলাম হোটেলে। কৃষ্ণ সাগর থেকে এজিয়ান সাগরের মিলনভূমি এই তুরস্কের পশ্চিমে গ্রিস ও বুলগেরিয়া; উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, পূর্বে ইরান; দক্ষিণে ইরাক, সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর, এবং দক্ষিণ উপকূলে সাইপ্রাস। আমার কল্পনায় তুমি আর আমি এক দীর্ঘ ছুটি নিয়ে এই দেশের আনাচে কানাচে ঘোরার স্বপ্ন বুনলাম, জানি স্বপ্ন তো স্বপ্নই, সত্যি হবার নয়। তবুও তো স্বপ্ন দেখি, এ স্বপ্ন ক’জন দেখতে পারে! শিল্পী জটিলেশ্বর মুখার্জির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলতেই পারি, ‘আমার স্বপন কিনতে পারে, এমন আমির কই…!’
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া