
মাধবী,
বিশ্বপূন্জের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সফররত টীমের সদস্য হিসেবে মাত্র ৪ দিনের জন্য নিউইয়র্ক শহরের বিশ্বসভায় অংশগ্রহণ আমার এবং আমাদের জন্য অনন্য এক অর্জন ছিলো এবার। নিত্যদিন সারাবেলা বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে সাইডলাইনের ছোট ছোট মিটিংগুলো ছিলো হৈ রৈ হীন পথের আলো, আমাদের ভবিষ্যতের কর্ম পরিকল্পনার পথরেখা। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে রুমে ফিরে যখন তোমার সাথে কল্পনায় খুনসুটি করতাম, তখন সারাদিনের ক্লান্তি দূর হতো। তোমার প্রতি ভালোবাসার রসায়ন, ডোপামিন হরমোন আমাকে জাগিয়ে রাখতো। এবারের অধিবেশনে যোগদান করা বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন বিশাল বহরের আদিখ্যেতা ছিলো না, অন্যদিকে তেমনই ঐতিহাসিক কিছু মূহূর্তের আবীর ছড়ানো মধুরিমা ছিলো। সুখের স্বপনেরা নিউইয়র্কের অলিন্দ বেয়ে ঝরেছিলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই অধিবেশন ছিলো অভিষেক, অভিষেক অধিবেশনে দেওয়া তাঁর অনবদ্য ভাষণ ছিলো হৃদয়গ্রাহী। যে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে বক্তৃতা দিলেন ঠিক সেখানে দাঁড়িয়েই তাঁর পিতা বাংলার রাখাল রাজা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাতা বেগম খালেদা জিয়া বক্তৃতা করেছিলেন। জাতিসংঘের ইতিহাসে এমন ত্রয়ী অংশগ্রহণ আর ঘটেনি, অদূর ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনাও দেখছি না। এবারের অধিবেশনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জন্য অন্য একটি আনন্দঘন মূহুর্ত ছিলো আরও একটি কারনে, সেটি হলো, তাঁর কেবিনেট সদস্য জনাব খলিলুর রহমান এবারের অধিবেশনে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে সভাপতিত্ব করেছেন। এবারের আয়োজনের নৈবেদ্য নিবেদনে আরও এক বিন্দু সুখ যোগ হয়েছিলো, সেটি হলো, এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তনয়া ব্যারিষ্টার জায়মা রহমান জাতিসংঘের লিগ্যাল অফিসার হিসেবে অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এ যেন সুখের চেয়েও সুখ পাওয়ার মূহুর্ত! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিলো স্লিম, কোন শব্দের আতিশয্যে ভরপূর ছিলো না, দেশ এবং মানুষ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা বক্তব্যে সু-প্রকাশিত, অস্থির এই সময়ে বিশ্ব দরবারের করণীয় কি তার আলোকপাত ছিলো, যুদ্ধ নয়-শান্তির আহবান ছিলো, এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের ডাকসহ অসংখ্য উপাদানে ভরপুর এই বক্তৃতা ছিলো এক কথায় হৃদয়গ্রাহী, শ্রতিমধূর, আলোর দিশারী, বাংলাদেশের মানুষের জন্য অহংবোধের মতো। কালের স্বাক্ষী এই বক্তৃতা শুনতে সভাকক্ষে স্বশরীরে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দিত, উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত। একরাশ মুগ্ধতায় ভরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতা অনেকের মতো আমার চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, আমার স্বপ্নদের আলোকিত-উদ্ভাসিত করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য তাই সমবেত সকলের মতো আমিও গর্বিত!
মাধবী,
নিউইর্য়ক থেকে ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছি, আপাততঃ লক্ষ্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি শহর। এই সময়ে প্লেনে খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া কোন কাজ নেই। আজ তোমার জন্য ঘুম এলো না, কিছুতেই ঘুম এলো না। ইউটিউবে অনেক শিল্পীর গান শুনছি, তার মধ্যে নজরুল সংগীত এবং দেশাত্মবোধক গান মনের কোণে একটু বেশী ছুঁয়ে গেলো। গুনগুন করে গেয়ে চলেছি- শাওণ ও রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে, নয়নে বারি ঝরে…..; আমায় নহে গো, ভালোবাসো শুধু, ভালোবাসো মোর গান….! তোমাকে ভাবছি, তোমার স্মৃতিরা মস্তিস্কের নিউরনে খেলছে। তুমি হয়তো ভালো আছো, নয় তো নেই, তবে আমার কল্পনায় মনে হয় দুঃখের উপত্যকা নয়, সুখের সমুদ্রে তুমি ভালো আছো! ভালো থেকো প্রানেশ্বরী।
মাধবী,
এর আগেও অনেকবার নিউইর্য়ক শহরে এসেছিলাম, প্রতিবার দেশে ফেরার আকুতি অনুভব করতাম, এবার কিন্ত সেই অনুভবের অনুভূতিতে কিছুটা পিছুটান অনুভূত হলো। মনে হলে তুমি পাশাপাশি ছিলে, মনে হলো তুমি আমার জীবনে রঙের আবীর ছড়ালে, মনে হলো তোমার নিদ্রাহীন রাতগুলো আমাকে নৈবেদ্য নিবেদনের সমারোহ, তোমার চোখের নিচে ঘুমহীনতার স্বাক্ষী আমার জন্যই। তোমার এই আয়োজন, এই নিবেদন, এই শব্দহীন আকুলতা, এই বাক্যহীন দৃষ্টি আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছে। আমার এই দ্বিধারা, এই পিছুটানের অনুভূতির জন্য তোমাকে মনপ্রাণ ভরে অভিশাপ দিয়েছি, খোদার কাছে বলেছি, হে খোদা, হে সারা জাহানের মালিক, তুমি তাঁকে এমন শাস্তি দাও যেন তাঁর আজন্মের নিদ্রার প্রান্ত অবধি আমিই থাকি তাঁর স্বপ্নের পুরুষ, তাঁর বেলা অবেলার সাথী, তাঁর সারাবেলার অসহ্য সুখের ঠিকানা। নিউইর্য়ক ছাড়ার সময় কল্পনায় কি তীব্রভাবে তুমি এলে, তোমার করুণ শুস্ক মুখ দেখে মনে হলো তুমি কবি আবুল হাসানের ‘নিঃসঙ্গতা’র মুখ, ঐ কবিতার ক্যানভাস, তোমার করুণ মুখের দিকে চেয়ে আমারও ক্ষণিকের জন্য কবির মতো মনে হলো-
‘অতটুকু চায়নি বালিকা, অত শোভা, অত স্বাধীনতা !
চেয়েছিলো আরো কিছু কম, আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিলো মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক ! অতটুকু চায়নি বালিকা,অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম ! চেয়েছিলো আরো কিছু কম, একটি জলের খনি তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিলো একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!’
মাধবী,
বিদায়ের সময় তোমার করুণ অপলক দৃষ্টি আমাকে ভাবিয়েছে, পরক্ষণেই ভাবলাম তোমাকে প্রবোধ দিয়ে বলি, অতবেশী ভেবো না এখন, দেখো আমার অভিশাপ কাজে লেগে যাবে, আমি রয়ে যাবো তোমার নিদ্রার প্রান্ত অবধি, তোমার স্বপ্নের পুরুষ হয়ে! শোনো মেয়ে, রুদ্রের মতো করে তোমাকে আশ্বস্ত করে বলি-
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে!
শু ভ অ প রা হ্ন
(লেখাটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া)