
ওয়াশিংটন পর্ব শেষ করে আমরা গেলাম মেমফিস শহরে, টেনেসি অঙ্গরাজ্যে। মেমফিসে যে হোটেলে আমাদেরকে রাখা হলো সেটি একটি বুটিক হোটেল,সুন্দর, ছিমছাম, মনোরম, পাঁচ তারকা সম মানের সুযোগ সুবিধা। হোটেল রুমে ঢুকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি সবুজ ঘাঁসের বিশাল লন, তারপরই একটি বড় স্রোতসীনি নদী। মনটা ভরে উঠলো। রুম থেকে বের হয়ে একা একাই হাঁটতে বের হলাম নদীর ধারে, জানলাম ওর নাম মিসিসিপি! অবাক বিস্ময়ে মিসিসিপি’র বুক চিরে বয়ে যাওয়া ছোট ছোট বোট, বহমান স্রোত এবং এর সৌন্দর্য দেখতে লাগলাম। মনের অজান্তেই গুনগুন করে ভূপেণ হাজারিকার গাওয়া ‘আমি এক যাযাবার…’ গেয়ে উঠলাম! কিছুক্ষণ পর এলিনা আপা, মাসুদ ভাই, করুণা দা’ আসলেন।
এক অনন্য বিকেল, গোধূলী লগণ, কণে দেখা আলো আমরা উপভোগ করলাম। এরপর সন্ধ্যায় পল আমাদের নিয়ে গেল শহরের এক ব্যাস্ততম রেস্টুরেন্টে ডিনার করাতে। যেতে যেতে এই শহরের ইতিবৃত্ত শুনলাম, পল বলে চললেন এই অঙ্গ রাজ্যের সূর্যসন্তানদের কথা। তাঁদের মধ্যে আমারিকান সঙ্গীত জগতের অমর স্রষ্ঠা এলভিস প্রিসলি এবং বিশ্ব স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ের প্রতিবেশী নোবেল জয়ী নাগরিক অধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং অন্যতম। দু’জনই এই শহরের আলো বাতাসে বড় হয়েছিলেন, সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। ডিনারের সময় পল কে জিজ্ঞেস করলাম, এই দু’জনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ী কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার সময় হবে কি না? পল জানালো, এলভিস প্রিসলি’র বাড়ী মেমফিস শহর থেকে অনেকটা দূরে, সময় হবে না। আর মার্টিন লুথার কিং এর স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় আমাদের পরের দিনই যাওয়ার কথা আছে।
পরেরদিন সকালে পল আমাদের নিয়ে গেলেন মেমফিস শহরের ‘লোরেন মোটেলে’ যেখানে ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ০৬.০১ মিনিটে ডঃ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে স্নাইপারের বুলেটে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়ে এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাঃ তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওখানে যাওয়ার পর প্রতিটি ঘটনা আমাদেরকে ব্যাখ্যা করে বুঝালেন ঘোষিত যাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আমাদেরকে দেখানো হলো মার্টিন লুথার কিং ‘লোরেন মোটেলে’ নিজের ঘরের সামনে বারান্দাযর কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়েছিল। আমাদের জানানো হলো, .৩০ ক্যালিবার রাইফেল বুলেটটি কিংয়ের ডান গালে প্রবেশ করে, ঘাড়ের মধ্যদিয়ে অবশেষে তাঁর কাঁধের শিরদাঁড়ায় গিয়ে আটকে যায়, তাঁকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু পরের দিন সকাল ০৭.০৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করা হয়।আমরা জানলাম আমেরিকান ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ নামক বর্ণবাদের শিকার মারটিন লুথারের মৃত্যুর পরে চারিদিকে সহিংসতা ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। হত্যাকান্ডের জন্য ক্ষোভে ফেটে পড়ে আমেরিকান অধিকার কর্মীরা, বিশেষ করে বহু কৃষ্ণাঙ্গ যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় নেমে আসে, চারদিকে বিশাল দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। আমরা জানতে পারি মার্টিন লুথার কিং এর হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আর্ল-রে নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবে কথিত আছে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নিজের পরিবার সহ অনেকেই বিশ্বাস করেন, গ্রেফতারকৃত ব্যাক্তি নির্দোষ ছিলেন।
‘লোরেন মোটেল’ থেকে বের হয়ে লান্চে গেলাম, সেখান থেকে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নেত্রীবৃন্দের সাথে দেখা করলাম, তাঁদের কাজের বিবরণ শুনলাম, কিন্ত আমার সমস্ত ভাবনার কেন্দ্রে রয়ে গেল সেই মার্টিন লুথার কিং এর খুন হওয়ার জায়গা, সেই রুম, সেই বিছানা! সারাদিনের কর্মসূচী শেষ করে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে ফিরে গেলাম মিসিসিপি’র তীরে ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া বাতাসের কাছে। আনমনে কানে ভেসে এলো মার্টিন লুথার কিং এর অসলো, নরওয়ে তে ১৯৬৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহনের সময় প্রদত্ত সেই অমর ভাষণ-
I believe that unarmed truth and unconditional
love will have the final word in reality. This is why
right, temporarily defeated, is stronger than evil
triumphant!
সাঁঝের আলোয় মিসিসিপিকে আরও রহস্যময়ী মনে হলো, দূরের ব্রিজের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম ডঃ কিং এর কোন আত্মা উড়ছে কি না।
(লেখাটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া)