
সংগৃহীত ছবি
মাধবী-২৬০
মোঃ আসাদুজ্জামান
রাজনৈতিক কর্মী।
৭ অক্টোবর, ২০২৬।
মাধবী,
প্রিয় কবি নাজিম হিকমতের শহর ইস্তানবুল এসে তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে। বসফরাস নদী পরিবেষ্টিত এশিয়া-ইউরোপের মিলনস্থল এ শহর আমার অনেক স্মৃতির, অনেক ভালোলাগার, অনেক প্রশান্তির, আমাকে অনেক উষ্ণতা দেয়। এ শহরে নেমেই আমার প্রিয় কবি নাজিম হিকমতের লেখা এবং সুভাষ মুখার্জির অনুবাদ করা ‘জেলখানার চিঠি’থেকে কল্পনায় তোমাকে আবৃত্তি করে শুনালাম, ‘প্রিয়তমা আমার, তেমার শেষ চিঠিতে তুমি লিখেছ - মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে, দিশেহারা আমার হৃদয়। তুমি লিখেছ, যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয়, তোমাকে যদি হারাই আমি বাঁচব না।’ আরও উচ্চারণ করলাম,
‘তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার, আমার স্মৃতি
কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, তুমি বেঁচে
থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী!!’ এগুলো আওড়াতে আওড়াতে সমবেত অভ্যর্থনা কারীদের মধ্যে এদেশের আইনমন্ত্রী এসে হাত বাড়ালেন, পাশের রুমে নিয়ে গেলেন, প্রাথমিক আলাপ আলোচনা শেষে প্রটোকল যখন গাড়ীতে তুলে নিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা করালো তখন এ শহরের মনোরম আবহাওয়াতেও ম্যাড়মেড়ে, রিক্ত নিঃশ্ব, শূণ্য মনে হলো নিজেকে। আজ কেন যেন নাজিম হিকমতের শ্বাশঃত প্রকাশ-‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ূ বড় জোর এক বছর’- মানতে কষ্ট হচ্ছে! আজ মনে হচ্ছে, ভালোবাসলে প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক জন্মের প্রান্ত অবধি থেকে, জীবনের গভীর গিরিপথে সে শোক অনন্তকাল হেঁটে চলে, শিরা উপশিরার অতল অতল বেঁয়ে বয়ে চলে সেই শোকের মিছিল! সুতরাং, শোকের আয়ু একবছর কথাটা সব সময় সঠিক নয়। এই যে ধরো, তোমার বিরহে প্রতিটি রাত আমার মনে হয় সহস্র রাতের নিরবতা, সহস্র দিনের শোক, তারপরও সেই শোক শেষ হয় না। আবার ধরো, শহীদ আবরার ফাহাদের না থাকা, তাকে হারানোর সাত বছর পরও অগনিত মানুষের মতো আমি আজও তাঁর শোকে পাথর, বিহ্বল এবং তাঁর শোকের শক্তিতে বলিয়ান। তাই বলি, এবারের ইস্তাম্বুল শহর, নাজিম হিকমতের প্রিয় দেশের শহরে এসে তোমাকে মনে পড়ার সাথেসাথে নাজিম হিকমতের কবিতার ঐ পংক্তিতে উল্লেখিত শোকের দীর্ঘায়ু নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলাম।
মাধবী,
বিপ্লবী চে গুয়েভারার ডায়েরীর দিনগুলো যেমন আমাকে নিত্যদিনের সংগ্রামে, শাসনে, দায়িত্বে এবং মানবিকতায় প্রেরণার অফুরাণ উৎস হয়ে রয়ে যায়, ঠিক তেমনি নাজিম হিকমতের লেখা ঐ ‘জেলখানার চিঠি’র অম্লান শব্দগুচ্ছ- ‘মৃত্যু…, দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু। কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো, জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায়, নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়। অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয় আমি দেখবো আমার বন্ধুদের, তোমাকে দেখবো, আমার সঙ্গে কবরে যাবে শুধু আমার এক অসমাপ্ত গানের বেদনা’ - আমার নিত্যদিনের সকল সাহসের অমর কাব্য মনে হয়! আজ এই শহরে এসে আরও একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় প্রণত হচ্ছি, তিনি হলেন আধুনিক তুরস্কের রুপকার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক, নাজিম হিকমতের প্রিয় বন্ধু এবং প্রানের শত্রু কামাল আতাতুর্ক এখনো মুসলিম বিশ্বের মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক, এখনো তিনি আমাদের কাছে শ্রদ্ধার, ভালোবাসার! অটোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি সুলতান সুলেমানের পর আধুনিক তুরস্কের সৌর্য, বীর্য অহংকারের অন্যতম পাদপীঠ এই কামাল আতাতুর্কের সংগ্রাম, সাহস এবং দর্শণ গোটা মুসলিম উম্মাহর কাছে অনুকরণীয় এক পথের দিশা। তাঁর সেই শহরে এসে আজ অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছে!
মাধবী,
আজ তোমার বিরহে বিষাদময় লাগছে, তোমাকে অনেক কিছু শুধোতে মন চাইছে, কিন্ত পাশের সীটে ঢাকায় পদায়িত তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত জনাব মোস্তফা ওসমান তুরানের বারবার ইন্টারভেনসনের কারনে কোন কিছুই তোমাকে শুধোতে পারলাম না। তবে, গভীর প্রনয়ে, গভীরতম দীর্ঘশ্বাসে কল্পনায় তোমাকে সামনে বসিয়ে বলেছি- ‘বধু আমার, তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি, চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি। কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে চায়!’ আরও বলেছি, ‘ভুলে যেও না, স্বামী যার জেলখানায় তার মনে যেন সব সময় ফুর্তি থাকে। বাতাস আসে, বাতাস যায়, চেরির একই ডাল একই ঝড়ে দুবার দোলে না। গাছে গাছে পাখির কাকলি, পাখাগুলো উড়তে চায়। জানালা বন্ধ: টান মেরে খুলতে হবে।’
মাধবী,
আজ নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠিতে বুঁদ হয়ে আছি, ঐ চিঠি আর তোমার প্রতি আমার অনুরাগের ছোঁয়ায় এক অন্যরকম সময় পার করছি ইস্তানবুল শহরের বসফরাস নদীর তীরে! এখানে বসে নাজিমের মতো করে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘আমি তোমাকে চাই ;তোমার মত রমনীয় হোক জীবন, আমার বন্ধু,আমার প্রিয়তমার মত….!’ পরক্ষনেই মনে হলো, তুমি তো কোথাও নেই, না এখানে, না ওখানে, শুধু কল্পনায় মাঝেমধ্যে আনাগোনা করো। তখন প্রতিবাদী হয়ে উঠি, নাজিমের কাছে ফিরি, তাঁর কাছ থেকে ধার করে নিয়ে বলি, ‘নতজানু হয়ে আমি চেয়ে আছি মাটির দিকে, উজ্জল নীল ফুলের মঞ্জরিত শাখার দিকে আমি তাকিয়ে, তুমি যেন মৃন্ময়ী বসন্ত, আমার প্রিয়তমা,আমি তোমার দিকে তাকিয়ে। মাটিতে পিঠ রেখে আমি দেখি আকাশকে, তুমি যেন মধুমাস, তুমি আকাশ, আমি তোমাকে দেখছি প্রিয়তমা। রাত্রির অন্ধকারে,গ্রামদেশে শুকনো পাতায় আমি জ্বালিয়েছিলাম আগুন, আমি স্পর্শ করছি সেই আগুন,নক্ষত্রের নিচে জ্বালা অগ্নিকুন্ডের মত তুমি আমার প্রিয়তমা, তোমাকে স্পর্শ করছি। আমি আছি মানুষের মাঝখানে,ভালবাসি আমি মানুষকে, ভালবাসি আন্দোলন, ভালবাসি চিন্তা করতে, আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি, আমার সংগ্রামের অন্তস্থলে মানুষের আসনে তুমি আসীন, প্রিয়তমা আমার, আমি তোমাকে ভালবাসি।’
মাধবী,
নাজিম হিকমতের জীবনে অসংখ্য রমনীরা এসেছিল, তুরস্কে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দিনগুলোতে। তাঁদের মধ্যে নুজহেত হানেম, মুনাভার গোনেন, পিরায়ে মেমসিওগ্লুর মতো প্রেয়সীরা এসেছিল। তাঁর প্রনয়ের পরিনতি হয়েছিল ভেরা তুলিয়াকোভা হিকমত ওরফে পিরায়ে হানিমের সাথে, ধরা হয় তিনি ছিলেন নাজিম হিকমতের শেষ প্রেমিকা এবং সহধর্মিণী। তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা জেলখানার চিঠি’র ‘বেঁচে থাকায় অনেক আশা,প্রিয়তমা, তোমাকে ভালবাসার মতই একাগ্র বেঁচে থাকা। কী মধুর-কী আশায় রঙ্গীন তোমার স্মৃতি….!’ কিংবা ‘যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর, তা আজও আমরা দেখিনি, সব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠে নি, আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো আজও আমরা পাইনি, মধুরতম যে-কথা আমি বলতে চাই, সে কথা আজও আমি বলি নি।’ কথাগুলো আজ তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে, একান্ত আপন মনে করে, একান্ত সঙ্গোপনে! আর পাশে ইউটিউবে শুনতে ইচ্ছে করছে, ‘ও কেন এতো সুন্দরী হলো, দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই…’
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া