
সংগৃহীত ছবি
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের একাধিক তারকা। পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপসহ আরও অনেকে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উদ্যোগে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা।
কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে পুলিশ। বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করা কয়েকশ মানুষ, সাংবাদিক ও আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাও ছিলেন।
পুলিশের ভূমিকার সমালোচনায় প্রকাশ রাজ
বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিনেতা ও অধিকারকর্মী প্রকাশ রাজ। কার্টুনিস্ট সতীশ আচার্যের একটি কার্টুন শেয়ার করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নাগরিকদের প্রতিবাদ থেকে আর কত দিন পালিয়ে থাকা হবে।
পরে এক ভিডিও বার্তায় বিক্ষোভকারীদের বিমানবন্দর ও বাসভবনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আটকের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। প্রকাশ রাজের ভাষ্য, তরুণদের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করা যায়নি; বরং এতে কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। এ লড়াই দীর্ঘ হবে এবং মানুষ প্রশ্ন তুলতে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিক্ষোভকারীদের সাহসিকতার প্রশংসা অনুরাগ কাশ্যপের
‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’খ্যাত নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপও বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। শনিবার ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে তিনি ভীতু ব্যক্তি, দাসত্বের মানসিকতা এবং লাখো সাহসী মানুষের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
অন্য একটি পোস্টে তিনি ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরার লাইভ অনুসরণ করার আহ্বান জানান। দিল্লি হাট এলাকায় কয়েকশ মানুষকে নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন নেহা। পরে তাকেও আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘এটা কি একনায়কতন্ত্র নয়?’ প্রশ্ন অপূর্ব আসরানির
বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন চলচ্চিত্র সম্পাদক ও নির্মাতা অপূর্ব আসরানিও। অভিজিৎ দীপকে, রত্না সিং ও ধ্রুব রাঠিকে আটকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, এ পরিস্থিতিকে একনায়কতন্ত্র বলা যায় কি না। অন্য একটি পোস্টে তিনি ‘গণতন্ত্রের অবসান’ বলে মন্তব্য করেন।
সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানিও পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবাদ করার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে নাগরিকেরা বাধার মুখে পড়ছেন। তার দাবি, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে পুরো শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
নির্মাতা শিরীষ কুন্দর এক্সে দেওয়া পোস্টে নিজ দেশের মানুষের প্রতিবাদ মোকাবিলায় বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আরেক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন, শিশুরাও যখন কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে মানুষ আর তাকে ভয় পাচ্ছে না।
এ ছাড়া নির্মাতা বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে বিক্ষোভকারীদের আটকের প্রতিবাদে একাধিক পোস্ট দেন। অভিনেতা মোহাম্মদ জিশান আইয়ুব জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখটের একটি কবিতার হিন্দি অনুবাদ শেয়ার করে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানান।
কৌতুকশিল্পী বীর দাসও এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক্সে ‘স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট’-এর ব্যাখ্যা শেয়ার করে তিনি ইঙ্গিত দেন, কোনো বিষয়কে দমিয়ে রাখার চেষ্টা অনেক সময় সেটিকে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ৪০ হাজারের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। যন্তর মন্তর এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয় এবং আশপাশের সড়কগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়।
এ ছাড়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে হিন্দি ও ইংরেজিতে মাইকিং করে জমায়েত, মিছিল ও সড়ক অবরোধের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার আওতায় এসব বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সাংবাদিক, আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ বিক্ষোভকারীদের আটকের খবরও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একাধিক ব্যক্তির প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ায় ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।