
সংগৃহীত ছবি
মাধবী-২৬২
মোঃ আসাদুজ্জামান
রাজনৈতিক কর্মী।
১৯ অক্টোবর, ২০২৬।
মাধবী,
শৈলকুপার স্নিগ্ধ বাতাস মেখে তোমাকে দিলাম একরাশ শারদ শুভেচ্ছা । কাক ডাকা ভোরে উঠতে হবে, ভাবলাম তোমাকে কিছু লিখে ঘুমোতে যাই। পাশে ইউটিউবে গান বাঁজছে, ‘….এখনো কি রাত নিঝুম হলে, শরৎ কাহিনী পাসে খোলা পড়ে থাকে…’! গানের লিরিক্সগুলো এই নিশীথে তোমার কাছে নিয়ে গেলো। খোলা ছাদে এসে বসলাম, ভাবলাম তোমাকে দু’ কথা লিখি।
মাধবী,
মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি কল্পনায় এসে আমার শরীর স্বাস্থ্য, মন মেজাজ, নেকবদ খোঁজ নাও। এভাবে যখন আসো তখন ভাবি, তোমার এই কেয়ারিং যতটা না প্রেমিকার অনুভবে রাঙানো, তার চে’ ঢের বেশী ল্যাটিন doctrin ‘loco parentis’ তত্বের আবরণে আচ্ছাদিত। তখন তোমাকে সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অন্চলে বসবাস করা কোন শীতল বৃদ্ধা মনে হয়। মনে মনে বলি, বুড়িদের সঙ্গে প্রেম করার এই এক যন্ত্রণা, হোক না তা কল্পনায়। তোমার উপস্থিতিতে আমার হৃদয়ে যখন ঝড় ওঠে, তখন তুমি তুমি নির্জীব পাথরের মতো বসে থাকো। যখন আমি একটু উত্তাপ চাই, কথার কিংবা স্পর্শের, এই ধরো একটু পাগলামি, একটু খুনসুটি, আর একটু গভীর প্রণয়ের, তখন তুমি হয়ে উঠো loco parentis, মনে হয় পৃথিবীর তাবৎ রোমান্টিকতা মোমের যাদুঘরে শোভা পাওয়ার অনুভব বিলোচ্ছো। এটাও কিন্ত এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। ইদানীং তোমার উপেক্ষা আর লোকো প্যারেন্টিস আচরণ, বিরোধী শিবিরের যুক্তিহীন সমালোচনা আর বৈশ্বিক আবহাওয়ার জন্য তোমার প্রেমহীন আনাগোনা গায়ে লাগে না, অভিমান করলেও টনক নড়ে না, একটু রোমান্টিতার দাবিকে মনে হয় সংসদে বিল পাস করার আবদার, যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ায় ফেলতে হয়। মাঝেমধ্যে এটাও ভাবি, তোমার মতো নির্ভেজাল ঠান্ডা প্রেমিকার প্রেমে পড়ে যে যন্ত্রণায় কাতর হই, তার জন্য তোমার কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া উচিত! তোমাকে দেখার সাধ সহস্র শতাব্দীর, জানি সে সখ মিটবে না, হয়তো এতো আবেগ, এতো সখ একদিন ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত হবে। তাই বলি, প্রয়োজনে সহস্র বছর পরে এসো, দেখে যেয়ো, কে বেশি অপেক্ষা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাহাড়- নাকি আমি!
মাধবী,
এই নির্জন নিশীথেও বাইরে শরতের স্নিগ্ধ আকাশ, আমি নিশ্চিত প্রকৃতির কোল জুড়ে কাঁশফুলের শ্বেত শুভ্র আবীর ছড়ানো আছে কোন না কোন প্রান্তরে। এই শরৎ মানে এই উপমহাদেশের সনাতনী ধর্মে বিশ্বাসীদের সবচে’ বড় ধর্মীয় উৎসব ‘দুর্গাপূজা’র হৈ রৈ আর বর্ণিল সমারোহ। সনাতনীরা বিশ্বাস করে, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের দ্বান্বিক বিজয়ের জন্যই প্রতিবছর পৃথিবীতে দেবী দূর্গা’র আগমন হয়। আমাদের মতো মতো মুসলিম কিংবা অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসের জায়গাটা কিন্ত ভিন্ন। সনাতনীদের সাথে আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের বিস্তর অমিল থাকলেও, এটা বাংলাদেশের মানুষ কমবেশি মেনে নিয়েছে যে, ধর্ম যার যার-উৎসব সবার! দুই বাংলায় দুর্গা পূজার উৎপত্তি এবং বিকাশের ইতিবৃত্ত ঘাঁটলে দেখা যাবে, এই উৎসব খ্রিষ্টীয় ১১ শতক বা তারও আগে বসন্ত কালে হতো যা পরম্পরায় প্রাচীন পাল ও সেন রাজাদের আমলে ‘দশপ্রহরণধারিণী সিংহবাহিনী দুর্গা’ প্রতিমার উপাসনায় রুপান্তরিত হয়। নথিপত্রে দেখা যায়, ১৪৮০ সালে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ প্রথম তাঁর বাড়িতে সার্বজনীন দুর্গা পূজার আয়োজন করে। ১৬০৯ কিংবা ১৬১০ সালে কলকাতার জমিদার কাশীম্বর দত্ত চৌধুরী বড়পরিসরে দুর্গাপুজো শুরু করে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১২ জন ব্রাহ্মণ যুবক মিলে প্রথম চাঁদা তুলে বারোয়ারি দুর্গা পূজার সূচনা করে যা ১৭৫৭ সালের পর কৃষ্ণনগরের শোভাবাজার রাজবাড়ীর নবকৃষ্ণদেব বাহাদুর বারোয়ারি পূজার মধ্যদিয়ে এতো হৈ রৈ, এতো সমারোহের মহাসড়কে তুলে দেয়।
মাধবী,
প্রতিবছর সনাতনীদের দুর্গাপূজা মহালয়া দিয়ে শুরু হয়ে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সনাতনীদের বিশ্বাস মতে, এই দিন দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং সেটাকে শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় স্মরণে রাখতে পূজারীরা ভোরে গঙ্গা বা যেকোনো নদীর ঘাটে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ ও পিন্ডদান করে, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে চন্ডীপাঠ বা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনে। মহালয়ার দিন কুমোরটুলিতে প্রতিমার চোখে আঁকা হয় বিশেষ রঙ, যা 'চক্ষুদান' নামে পরিচিত। এরপর একে একে আসে ‘অকাল বোধন’ বা মহা ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমী বা বিসর্জনের প্রহর । পুরাণমতে, দূর্গাপূজা হতো বসন্তকালে। শরৎকালে দেবী দূর্গা নাইওরে বা বাপের বাড়ী বেড়াতে এসে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন রামচন্দ্র তাঁর বাড়ীর সামনে বেলতলায় এসে দেবী দূর্গার আরাধনা ও পূজা করেন, তাঁর ঘুম ভাঙান। লঙ্কার রাজা রাবণ সীতাকে অপহরণ করার পর রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধারে যাওয়ার জন্য শ্রীরামচন্দ্র ঘুমন্ত দেবীকে ডেকে তুলে আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য এই আয়োজন করেছিলেন। তখন থেকে দূর্গাপূজা বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে হয়। তাই এই ষষ্ঠী তিথিকে বলা হয় ‘অকাল বোধন’। পূজারীরা সপ্তমীর দিনে সকালে নটি গাছের ডাল দিয়ে প্রতীকী দেবী তৈরী করে নদী বা জলাশয়ে স্নান করিয়ে মন্দিরে এনে দেবীর ডানপাশে স্থাপন করে দেবীর মহাস্নান করায়। অষ্টমীতে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয় যা ‘কুমারী পুজা’ হিসেবে পরিচিত। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিটের যে পবিত্র সময় থাকে, তাকে ‘সন্ধিপূজা’ জ্ঞান করা হয়, সনাতনীরা বিশ্বাস করে এই সময়েই দেবী দূর্গা
চামুণ্ডা রূপে চণ্ড ও মুণ্ড কিংবা শুম্ভ-নিশুম্ভ অসুর বধ করেছিলেন। মহাননবমীর দিনে মহাসমারোহে দেবীর আরাধনা, হোম ও যজ্ঞ করা হয়। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেবীর চূড়ান্ত বিজয়ের আনন্দ এই দিনে উদযাপিত হয়।এরপর বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে কৈলাসে তাঁর স্বামী শিবের কাছে ফিরে যাওয়ার আয়োজন করে।
মাধবী,
আজ আর না লিখি, না প্রেম, না প্রণয়ের অপেক্ষায় রই। মান্নাদের কন্ঠের গান ইউটিউবে বেঁজে উঠলো-গভীর হয়েছে রাত, পৃথিবী ঘুমায়, আমার দু’চোখে ঘুম আসেনা, কেন ঘুম আসে না, ঘুমের সে রাত গেছে হারিয়ে……. ! মন উঁচাটন হয়ে উঠলো, বিছানায় যাই!
শু ভ রা ত্রি!
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া