
সংগৃহীত ছবি
জীবনে কখনো কখনো নানা সংকট ও দুশ্চিন্তা মানুষকে হতাশ করে তোলে। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কাজের সন্ধান না পাওয়া, সংসারের অভাব-অনটন কিংবা প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য না আসায় অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ, সৎপথে চেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
ইস্তিগফার অর্থ আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ ও ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া। এটি কেবল অতীতের পাপের জন্য অনুশোচনা প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাঁর দিকে ফিরে আসারও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
ইস্তিগফার ও রিজিকের বরকত সম্পর্কে কোরআনের বাণী
পবিত্র কোরআনে হজরত নূহ (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর সম্প্রদায়কে ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
অর্থ: ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান আর প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’
—সুরা নূহ, আয়াত ১০-১২
এই আয়াতগুলোতে ইস্তিগফারের সঙ্গে আল্লাহর রহমত, বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির নিয়ামতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর অনুগ্রহ কামনা করা।
সংকট ও দুশ্চিন্তায় ইস্তিগফারের শিক্ষা
ইসলামি বর্ণনায় নিয়মিত ইস্তিগফারের মাধ্যমে সংকট থেকে মুক্তির পথ ও রিজিক লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে বলা হয়েছে—
مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকীর্ণতা থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করেনি।’
—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৫১৮
এই বর্ণনা থেকে ইস্তিগফারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। তবে ইস্তিগফার করলেই সব সমস্যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দূর হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা হিসেবে বিষয়টিকে দেখা উচিত নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করাও জরুরি।
কীভাবে ইস্তিগফার করবেন?
ইস্তিগফারের জন্য সহজ একটি বাক্য হলো—
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
কাজের ফাঁকে, চলাফেরার সময় কিংবা নিরিবিলি পরিবেশে বসে আন্তরিকতার সঙ্গে এই বাক্যটি পড়া যায়। চাইলে সাইয়্যিদুল ইস্তিগফারও পাঠ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করা এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ইস্তিগফারের পাশাপাশি চেষ্টা ও ধৈর্য জরুরি
জীবনের সব পরিস্থিতি মানুষের ইচ্ছামতো চলে না। কখনো দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সংকটই জীবনের সব সম্ভাবনার সমাপ্তি নয়। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমতের আশা রাখা, নিয়মিত দোয়া করা এবং বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মসংস্থানের সমস্যা থাকলে নতুন দক্ষতা অর্জন, উপযুক্ত কাজের সন্ধান এবং বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সংসারের আর্থিক সংকটে ব্যয় পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও সহায়ক হতে পারে। এসব চেষ্টার পাশাপাশি ইস্তিগফার ও দোয়া মানুষকে আত্মিক প্রশান্তি এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দেয়।
তাই জীবনের সংকটময় সময়ে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য প্রার্থনা করুন। আন্তরিক ইস্তিগফার, সৎকাজ, ধৈর্য এবং অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও জীবনে বরকত কামনা করুন।