
প্রতীকী ছবি
পবিত্র কুরআনে দাম্পত্য জীবনকে মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু পারিবারিক বন্ধন নয়, বরং পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা ও অধিকার রক্ষার এক পবিত্র অঙ্গীকার। তাই সুখী ও শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তুলতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
বিদায় হজের ভাষণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন—
أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا، وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا
অর্থ: ‘জেনে রাখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার রয়েছে, আর তোমাদের ওপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে।’ (তিরমিজি: ১১৬৩, ইবনে মাজাহ: ১৮৫১)
অন্য একটি হাদিসে নারীদের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
অর্থ: ‘তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (তিরমিজি: ৩০৮৭)
স্বামী কতদিন স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকতে পারবেন?
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে বসবাস, পারস্পরিক অধিকার রক্ষা এবং একে অপরের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে জীবিকার প্রয়োজনে, চাকরি কিংবা অন্য কোনো জরুরি কারণে স্বামীকে কখনো কখনো স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকতে হতে পারে।
ইসলামি ফিকহের আলোচনায় এ ক্ষেত্রে চার মাসের একটি সময়সীমার কথা উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে স্ত্রীর অধিকার ও দাম্পত্য সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিন আলাদা থাকার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সব পরিস্থিতিতে চার মাসকে অভিন্ন ও চূড়ান্ত সীমা হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়; এ বিষয়ে পরিস্থিতি, স্ত্রীর সম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট শরিয়তি বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হজরত ওমর (রা.)-এর সময়ের একটি ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে এ বিষয়ে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এক রাতে খলিফা হজরত ওমর (রা.) জনগণের খোঁজখবর নেওয়ার সময় এক নারীর বিরহের কবিতা শুনতে পান। কবিতায় ওই নারী দীর্ঘদিন স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট প্রকাশ করছিলেন।
পরদিন ওই নারীকে ডেকে তাঁর স্বামীর অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান হজরত ওমর (রা.)। নারীটি জানান, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।
এরপর হজরত ওমর (রা.) তাঁর কন্যা হজরত হাফসা (রা.)-এর কাছে জানতে চান, একজন নারী স্বামীর কাছ থেকে দূরে থেকে কতদিন ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। জবাবে হাফসা (রা.) চার মাসের কথা উল্লেখ করেন।
এরপর হজরত ওমর (রা.) সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর তাঁদের বাড়িতে ফেরানোর এবং অন্যদের দায়িত্বে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ১২৫৯৪)
দীর্ঘদিন দূরে থাকার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
১. স্ত্রীর অধিকার ও সম্মতি
চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে দীর্ঘদিন দূরে থাকতে হলে স্ত্রীর অধিকার ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। পারস্পরিক আলোচনা ও সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু সম্মতি থাকলেই সব পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন আলাদা থাকা শরিয়তসম্মত হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
২. গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
দীর্ঘদিন আলাদা থাকার কারণে স্বামী বা স্ত্রীর কেউ গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দূরে থাকার সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করা জরুরি।
৩. পারস্পরিক দায়িত্ব ও মানসিক প্রয়োজন
দাম্পত্য জীবনে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালনই যথেষ্ট নয়। স্বামী-স্ত্রীর মানসিক চাহিদা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সান্নিধ্যের প্রয়োজনও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘদিন দূরে থাকলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।
ইসলামি ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে শরিয়তের বিধান জানতে নাসাঈর হাদিস, ফতোয়ায়ে শামি, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ও *আহসানুল ফতোয়া*সহ নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
দাম্পত্য জীবনে ভারসাম্য রক্ষাই মূল কথা
ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ককে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও অধিকার রক্ষার ভিত্তিতে গড়ে তোলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই জীবিকার প্রয়োজনে স্বামীকে দূরে থাকতে হলেও স্ত্রীর অধিকার ও মানসিক প্রয়োজন উপেক্ষা করা উচিত নয়। একইভাবে, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয়ের পরিস্থিতি ও শরিয়তের নির্দেশনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে পারস্পরিক অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে শান্তিপূর্ণ, কল্যাণময় ও বরকতময় দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।