
সংগৃহীত ছবি
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি। আল্লাহর প্রতি গভীর ভয়, বিনয় ও আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি তাঁর জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। খেলাফতের মতো গুরুদায়িত্ব পালন করেও তিনি সব সময় আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ করতেন। তাঁর সেই আল্লাহভীতি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
আল্লাহভীতি ও দায়িত্ববোধে অনন্য আবু বকর (রা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন হজরত আবু বকর (রা.)। তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালে মুক্তি লাভ করা।
আল্লাহর প্রতি তাঁর ভয় ও দায়িত্ববোধ এত গভীর ছিল যে, খেলাফতের দায়িত্বকে তিনি অত্যন্ত কঠিন আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। এই দায়িত্ব পালনে কোনো ভুল হলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এমন চিন্তা তাঁকে সব সময় সতর্ক রাখত।
মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর মতো নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করতেন, এমন কাউকে তিনি দেখেননি বলে উল্লেখ করা হয়।
কোরআনের আয়াত শুনে কেঁদেছিলেন আবু বকর (রা.)
আল্লাহর ভয় হজরত আবু বকর (রা.)-এর অন্তরে কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা যায় কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া থেকে। কোরআন পাঠের সময় তিনি প্রায়ই কাঁদতেন। তাঁর মতে, আল্লাহর ভয়ে কান্না আসা মুমিনের অন্তরের কোমলতার একটি প্রকাশ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনায় জানা যায়, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হজরত আবু বকর (রা.) উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সূরা নিসার ১২৩ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়।
আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَنۡ یَّعۡمَلۡ سُوۡٓءًا یُّجۡزَ بِهٖ ۙ وَ لَا یَجِدۡ لَهٗ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَلِیًّا وَّ لَا نَصِیۡرًا
অর্থ: ‘যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করবে, তাকে তার প্রতিফল দেওয়া হবে। আর আল্লাহ ছাড়া সে নিজের জন্য কোনো অভিভাবক বা সাহায্যকারী পাবে না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৩)
আয়াতটি শুনে হজরত আবু বকর (রা.) গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, এ আয়াত শুনে তাঁর মনে হচ্ছে, যেন তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। তিনি আরও বলেন, মানুষের মধ্যে এমন কে আছে, যে কোনো মন্দ কাজ করেনি? তাহলে কি সবাইকেই নিজেদের কাজের প্রতিফল ভোগ করতে হবে?
বর্ণিত ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং মুমিনদের দুনিয়ায় ভোগ করা দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদকে তাদের গুনাহের কাফফারা হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেন। এর মাধ্যমে মুমিনের জীবনে পরীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ফুটে ওঠে।
একটি পাখি দেখে নিজের পরিণতি নিয়ে ভাবতেন
হজরত আবু বকর (রা.)-এর আল্লাহভীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, একবার তিনি গাছের ডালে বসে থাকা একটি পাখিকে দেখে বলেছিলেন, পাখিটি কতই না সৌভাগ্যবান! সে গাছের ডালে বসে, ফল খায় এবং ইচ্ছামতো উড়ে বেড়ায়। অথচ তার মানুষের মতো হিসাব-নিকাশের দায়িত্ব নেই।
এরপর তিনি নিজের পরিণতি নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন। এমনকি তিনি যদি রাস্তার পাশের একটি গাছ হতেন, কোনো উট সেটি খেয়ে হজম করার পর বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিত—তবুও যেন তাঁর জন্য ভালো হতো, এমন কথাও বর্ণনায় এসেছে।
এই বক্তব্যের মূল শিক্ষা হলো, আখিরাতের জবাবদিহি নিয়ে তিনি কতটা চিন্তিত থাকতেন। দুনিয়ার সম্মান, ক্ষমতা কিংবা মর্যাদা তাঁকে পরকালের হিসাব থেকে উদাসীন করতে পারেনি।
আল্লাহভীতি মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, আল্লাহকে ভয় করা মানে শুধু শাস্তির আশঙ্কা করা নয়; বরং প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া, অন্যায়ের পথ থেকে দূরে থাকা এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।
একজন শাসক হোক কিংবা সাধারণ মানুষ—প্রত্যেকেরই নিজের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। আল্লাহভীতি মানুষকে বিনয়ী করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন করে এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
তাই মুমিনের উচিত দুনিয়ার ব্যস্ততার মধ্যেও আখিরাতের কথা স্মরণ রাখা, নিজের ভুলের জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকা।
দোয়া: আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত তাকওয়া অর্জন, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।