
সংগৃহীত ছবি
ভারতে সরকারবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) পর এবার আলোচনায় এসেছে ‘মাছি জনতা পার্টি’ (এমজেপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক এই ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ আত্মপ্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক অনুসারী ও দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একই সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথ কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে সংগঠনটি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইনস্টাগ্রামে আলোচনায় আসে মাছি জনতা পার্টি। ‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না’—প্রধান বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ থেকেই সংগঠনটির নাম ও ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যের অনুপ্রেরণা এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মপ্রকাশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এমজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ৪০ লাখের বেশি ভিউ এবং ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অনুসারী যুক্ত হয়েছেন। সংগঠনটি বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি ও আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতিও প্রকাশ করেছে।
মাছি জনতা পার্টি মূলত ইনস্টাগ্রামভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ডিজিটাল রেকর্ড অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের জুনে তৈরি করা হয়েছিল। একাধিকবার নাম পরিবর্তনের পর বর্তমানে ‘makhijantaparty.ig’ ব্যবহারকারীনামে এটি সক্রিয় রয়েছে।
আর্যন নামের এক শিক্ষার্থী নিজেকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি সংগঠনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখপাত্র নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরাই এমজেপির কার্যক্রমের মূল বৈশিষ্ট্য। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির বক্তব্য ও পরবর্তী পোস্টগুলোতেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত ৯ অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশনের শুনানি হয়। ককরোচ জনতা পার্টির ১০ অক্টোবরের প্রস্তাবিত ‘দিল্লি স্তব্ধ’ কর্মসূচির আগে রাজধানীতে ইন্টারনেট, মেট্রো ও ট্রেন চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধে ওই আবেদন করা হয়েছিল।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন, নিরাপত্তার প্রয়োজনে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তবে পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া সমীচীন নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটা মাছি মারতে তো আর হাতুড়ি ব্যবহার করা চলে না।’
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই নিজেদের ব্যঙ্গাত্মক অবস্থান তুলে ধরে মাছি জনতা পার্টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে সংগঠনটি জানায়, মাছিকে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই; বরং সেই মাছিই এবার নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি চলমান প্রতিবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সংগঠনটি।
মাছি জনতা পার্টির আগে ভারতে আলোচনায় আসে ককরোচ জনতা পার্টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মে মাসে একটি শুনানির সময় শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে বেকার তরুণদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। ওই মন্তব্যের পর ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সিজেপি।
পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি। পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তরে তাদের আন্দোলনও আলোচনায় আসে। ওই আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তবে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন না করা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি বাতিল করে। পরে যন্তর মন্তর এলাকার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজেদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বক্তব্যে এমজেপি জানিয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথ কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক আন্দোলন ও প্রতিবাদ ঘিরে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে সংগঠনটি।
যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সিজেপির নেতাদের আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মাছি জনতা পার্টি। সংগঠনটির বক্তব্য, প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যদি আন্দোলনকারীরা নিজেদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ না পান, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আইসা (AISA) নেত্রী নেহা বোরার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মাছি জনতা পার্টি। একই সঙ্গে আইন মেনে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে আটক করা হয়। তাঁদের আটকের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে এমজেপি প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যদি মানুষকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ কী?
সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দূরত্ব নয়, গণতন্ত্রে প্রয়োজন সংলাপের।’
ককরোচ জনতা পার্টির পর মাছি জনতা পার্টির আবির্ভাব ভারতে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আদালতের একটি পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে সংগঠনের নামকরণ, অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক অনুসারী অর্জন এবং অন্য প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে এমজেপির এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কতটা সংগঠিত রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আপাতত ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য এবং বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে সংগঠনটি।