রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ● ২ কার্তিক ১৪৩৩

শিরোনাম: বৈধ পথে ইতালি নেওয়ার প্রলোভনে ৪৬ লাখ টাকা আদায়, লাটভিয়ার জঙ্গলে সোহেল রানার মৃত্যু   জেডআরএফের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান   ককরোচ জনতা পার্টির পর এবার মোদির বিরুদ্ধে নামছে ‘মাছি জনতা পার্টি’   গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের রায় স্থগিত   শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র উত্তরা, ১৫০০ জনকে আসামি করে ২ মামলা   শরণখোলায় গৃহবধূর মৃত্যু, কথিত স্বামী পলাতক   প্রবাসে থেকেও প্রতিটি সংকটে মানুষের পাশে ছিলেন তারেক রহমান: রিজভী   
বৈধ পথে ইতালি নেওয়ার প্রলোভনে ৪৬ লাখ টাকা আদায়, লাটভিয়ার জঙ্গলে সোহেল রানার মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৭ পিএম   (ভিজিট : ১২০)

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

বৈধ পথে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ৪৬  লাখ টাকা আদায়, বিদেশে নিয়ে জিম্মি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি কথিত মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে।


পরিবারের দাবি, সোহেল রানাকে অবৈধ পথে ইউরোপে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর তাঁরা দুইবার তাঁর দেশে ফেরার টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। বরং এরপর তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং শারীরিক নির্যাতন আরও বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।


একপর্যায়ে অসুস্থ অবস্থায় লাটভিয়ার একটি জঙ্গলে ফেলে রাখা হয় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের সোহেল রানাকে। পরে উদ্ধার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশি আবেদন করেছেন। বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর ঝিনাইদহের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এফআইআর (FIR) রুজুর নির্দেশ দিয়েছেন।


এদিকে একই গ্রামের আরও ১০ থেকে ১২ জনের কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।



ইতালি পাঠানোর আশ্বাসে ৪৬ লাখ টাকা, দেশে ফেরার চেষ্টাও ব্যর্থ :



নিহত সোহেল রানার পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে বৈধভাবে ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৪৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে কাতার থেকে মিশর এবং মিশর থেকে বেলারুশে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে জঙ্গলের পথ ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেল রানাকে অবৈধ পথে ইউরোপে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর তাঁরা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। এ জন্য প্রথমে কাতার থেকে বাংলাদেশে ফেরার একটি টিকিট কেনা হয়। পরবর্তী সময়ে মিশর থেকে বাংলাদেশে ফেরার জন্যও আরেকটি টিকিটের ব্যবস্থা করে পরিবার।


তবে দুইবার টিকিটের ব্যবস্থা করা হলেও সোহেল রানাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের। তাঁদের দাবি, তিনি অবৈধ পথে ইউরোপে যেতে রাজি না হওয়ায় এবং দেশে ফেরার চেষ্টা করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন। পরিবারের অভিযোগ, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ার পর তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়।



পরিবারের দাবি, দেশে ফেরার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সোহেল রানা কার্যত অসহায় অবস্থায় পড়ে যান। এরপর তাঁকে বেলারুশ থেকে লাটভিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং একপর্যায়ে অসুস্থ অবস্থায় একটি জঙ্গলে ফেলে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।



ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ:


পরিবারের অভিযোগ, বিদেশে অবস্থানকালে সোহেল রানাকে জিম্মি করে মারধর করা হতো এবং তাঁর মুক্তির কথা বলে স্বজনদের কাছে বারবার টাকা দাবি করা হতো। নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়েও পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।



স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবারের কাছ থেকে সর্বমোট প্রায় ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। 


পরিবারের দাবি, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে অর্থ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সোহেল রানাকে জিম্মি করে আরও অর্থ আদায়ের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।



লাটভিয়ার জঙ্গল থেকে উদ্ধার, পরদিন মৃত্যু :

সোহেল রানার কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং লাটভিয়ার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাসপোর্টের ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানোর পর চলতি মাসের ১২ অক্টোবর পরিবার তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।


পরিবারের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর অসুস্থ অবস্থায় সোহেল রানাকে লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। পরদিন, ৮ অক্টোবর, তিনি সেখানে মৃত্যুবরণ করেন বলে তাঁদের জানানো হয়েছে।


তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন পরিবারের সদস্যরা।



অভিযোগে একই পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নাম :

সোহেল রানার পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মোসাম্মৎ শামসুন নাহার, শাহজাহান সরকার, সোহাগ সরকার, নাসির সরকার, আব্দুর রাজ্জাক, তন্নী সরকার, সোহেল সরকার, রিয়াদ দেওয়ান ও শরীফুল সরকার।



পরিবারের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হতো। পরে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিম্মি করে তাঁদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতন করা হতো।


অভিযোগকারীদের দাবি, সোহাগ সরকার ও নাসির সরকার আপন দুই ভাই। তাঁদের একজন ইতালিতে এবং অন্যজন কাতারে অবস্থান করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।



একই গ্রামের আরও ১০–১২ জনের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ :

সোহেল রানার ঘটনার বাইরে একই গ্রামের আরও ১০ থেকে ১২ জনের কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় একাধিক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অর্থ নেওয়ার পর বিদেশে নিয়ে জিম্মি করা এবং পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে সোহেল রানার ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


অভিযোগগুলো সত্য হলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীর বক্তব্য সংগ্রহ করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


আদালতের এফআইআর রুজুর নির্দেশ :

সোহেল রানার স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ঝিনাইদহের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে নালিশি আবেদন দাখিল করেন। বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিরীন নাহার এফআইআর রুজুর নির্দেশ দেন।


বাদীপক্ষের দাবি, অভিযোগের প্রতিটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সোহেল রানার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ আদায়, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি এবং নির্যাতনের অভিযোগগুলো যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


আদালতের নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট থানায় এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া গেলে প্রতিবেদনে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য যুক্ত করা যাবে।



সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি :


সোহেল রানার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে এনেছে। বৈধ পথে ইতালি যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়া, দেশে ফেরার চেষ্টা ব্যর্থ করা এবং পরবর্তী সময়ে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত চান তাঁরা।


ইতিমধ্যে সোহাগ সরকারের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মুঠোফোনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ০১৭৬২*৬৫ নম্বর থেকে জয় বাহাদুর নামের এক ব্যক্তি ফোন করে পরিবারের সকল সদস্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হতে পারে। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হুমকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।



নিহতের পরিবারের দাবি, সোহেল রানার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, তাঁর সঙ্গে বিদেশে কী ঘটেছিল তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


একই সঙ্গে একই গ্রামের অন্য সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তদন্তের আওতায় এনে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, জিম্মি করে অর্থ আদায় ও নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।



সোহেল রানার পরিবার এখন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]