
সংগৃহীত ছবি
রাজপথে তার মুখের পোস্টার, মিছিলে তাকে ঘিরে স্লোগান, সংসদ থেকে আদালত সবখানেই তাকে নিয়ে তুমুল বিতর্ক। অথচ এত আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। তিনি কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমন প্রশ্ন তুলেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার। সংবাদমাধ্যমটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে কোনো সংবাদ সম্মেলন, প্রকাশ্য অনুষ্ঠান কিংবা নির্বাচন কমিশনের নিয়মিত প্রচারমূলক কার্যক্রমে দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম হিসেবে ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের প্রকাশিত একটি ছবিতে তাকে দেখা যায়। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্ঞানেশ কুমারের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, মন্দির পরিদর্শন, বক্তব্য কিংবা বিদেশ সফরের ছবি ও ভিডিও প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ করা হতো। গত ২২ সেপ্টেম্বর এক দিনেই তার তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর হঠাৎ করেই সেই উপস্থিতিতে ছেদ পড়ে।
বিতর্কের সূত্রপাত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত *ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের* একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে ঘিরে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্য।
এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর ভোটার তালিকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা পর্যালোচনার ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং তাদের নেওয়া সব পদক্ষেপই আইনসম্মত।
এদিকে বিতর্ক চলার মধ্যেই উত্তরপ্রদেশে জ্ঞানেশ কুমারের নির্ধারিত দুটি তরুণ ভোটার সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। নির্বাচন কমিশন জানায়, প্রতিবাদের কারণে নয়, আয়োজনসংক্রান্ত সমস্যার কারণেই অনুষ্ঠান দুটি স্থগিত করা হয়েছে।
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই এবং দিল্লির সাবেক উপরাজ্যপাল নজিব জংয়ের মতো ব্যক্তিরাও জ্ঞানেশ কুমারের কাছে স্মারকলিপি পৌঁছে দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, স্বাধীন সাংবাদিক নরেন্দ্র নাথ তার সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছেন, যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে রাজি হননি অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে দ্য ওয়্যার।
এদিকে সোমবার (১২ অক্টোবর) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে কয়েকশ মানুষ সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেছেন। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়নি। ভুলবশত যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা পুনরায় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
বিতর্ক, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে দিল্লিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার হচ্ছে। একই সঙ্গে জোরালো হচ্ছে জ্ঞানেশ কুমারের প্রকাশ্যে না আসার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন।
তবে প্রশ্নটি শুধু তার অবস্থান নিয়ে নয়, বরং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা নিয়েও। ভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান জনসমক্ষে এসে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন কবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।