মো. সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

গ্রীষ্মের আমের মৌসুম শেষ হয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট ও গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া আমবাজারে থেমে নেই আমের বেচাকেনা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারে সারি সারি ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে পাকা ও কাঁচা-পাকা আম। বাগান থেকে আম এনে বিক্রি করছেন চাষিরা। দরদাম করছেন পাইকারেরা। আম কিনছেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তারা।
মৌসুমের প্রচলিত সময় পেরিয়েও বাজারে আমের এই সরব উপস্থিতির পেছনে রয়েছে বারোমাসি কাটিমন, বারি আম-২০, কল্যাণভোগসহ বিভিন্ন নাবি জাতের আম। এসব জাতের চাষ সম্প্রসারণের ফলে আম উৎপাদন ও বিপণনের সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ।
শত বছরের আমের ঐতিহ্যে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই পরিবর্তন কেবল নতুন জাতের আম চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মৌসুমি আমের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে বছরজুড়ে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের দিকে এগোচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তাঁদের প্রত্যাশা, বারোমাসি আমের চাষ ও বাজার সম্প্রসারিত হলে কৃষকের আয় বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের বিভিন্ন বাজারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সরবরাহ দীর্ঘায়িত হবে।
গতকাল রোববার ঐতিহ্যবাহী কানসাট আমবাজারে কথা হয় আম ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, গোমস্তাপুর উপজেলার বরেন্দ্র এলাকায় তাঁর ১০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের চাষ রয়েছে। এবার বাগানে ভালো ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধেক বাগানের আম বিক্রি করেছেন। আরও প্রায় তিন সপ্তাহ আম বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে প্রতি মণ আম সাত হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ১০ হাজার টাকা হয়েছে।
গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের মেডিকেল মোড়ে গড়ে ওঠা বারোমাসি আমের বাজারটি এ পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। আমচাষি মনিমুল হক জানান, প্রায় তিন বছর আগে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের সাত-আটটি উপজেলার চাষিরা এখানে আম নিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বাজারটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার আম কেনাবেচা হয়।
গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা এলাকার কৃষক ওলিউল ইসলাম নিজের বাগানের আম নিয়ে এসেছিলেন বোয়ালিয়া বাজারে। তিনি জানান, কয়েক বছর মৌসুমি আম চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। পরে পুরোনো আমগাছ কেটে কাটিমন আমের চাষ শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে তিনি এই বাজারে আম বিক্রি করছেন।
কানসাট আমবাজারে আম নিয়ে আসা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসায় কাটিমন আমের দাম অনেক সময় প্রচলিত মৌসুমি আমের তুলনায় বেশি থাকে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কাটিমন আম প্রতি কেজি ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে প্রতি মণের দাম উঠছে আট থেকে নয় হাজার টাকা পর্যন্ত।
তিনি জানান, ঢাকার বাজারেও কাটিমন আমের চাহিদা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফলের দোকান, ফুটপাত, ভ্যান ও পাড়া-মহল্লার বাজারে অন্যান্য ফলের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে এই আম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমেও বাড়ছে বিক্রি। ফেসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সরাসরি ক্রেতার কাছে আম পাঠাচ্ছেন।
শিবগঞ্জের আমচাষি আহসান হাবিব জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখন নিজস্ব বাগানের আমের পাশাপাশি অন্য কৃষকের বাগান থেকেও আম সংগ্রহ করছেন। পরে সেসব আম রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
আমের আড়তদার নাইম হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ টাকার আম কেনেন। পরে সেগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়।
নাইম হোসেনের মতে, বারোমাসি আমের উৎপাদন বাড়লে দেশের বাইরেও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আমের মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনব্যবস্থা আরও উন্নত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের সময় বাড়ানো গেলে কৃষকের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি ভোক্তারাও বছরের বিভিন্ন সময়ে মানসম্মত আম কেনার সুযোগ পাবেন।
উল্লেখ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতিতে বারোমাসি জাতের বিস্তার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। প্রচলিত আমের মৌসুম শেষ হলেও বাগানে ফলন, বাজারে বেচাকেনা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ অব্যাহত থাকায় কৃষি ও বিপণনব্যবস্থায় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে উৎপাদনের মান, বাজারব্যবস্থা এবং রপ্তানির উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।