
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনির প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড বা ২৪৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন দেশটির হাইকোর্ট। অর্থ পাচার, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয়।
লন্ডনের রিজেন্টস পার্কের কাছে অবস্থিত ফ্ল্যাটটি অবৈধ অর্থে কেনা হয়ে থাকতে পারে—এমন সন্দেহে তদন্ত করছে এনসিএ। ২০২৩ সালে সম্পত্তিটি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এর প্রকৃত মালিক। যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইনের আওতায় এ ধরনের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে সম্পদটি অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছে বলে বিবেচনার আইনি ভিত্তি তৈরি হতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম *ফিন্যান্সিয়াল টাইমস* এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখতে জটিল কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে এনসিএ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পত্তিটির মালিকানাসংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে তৃতীয় একটি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফ্ল্যাটটি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
এনসিএর বৃহত্তর তদন্তের অংশ হিসেবে ফ্ল্যাটটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সংস্থাটি আদালতে জানায়, সম্পত্তিটির সঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের সন্দেহজনক যোগসূত্র রয়েছে। তাদের দাবি, ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিক আনিসুজ্জামান ‘রনি’ চৌধুরী। তাঁর কোম্পানি যে অর্থ দিয়ে সম্পত্তিটি কিনেছে, সেই অর্থের উৎস তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
এনসিএর এক তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে লিখিত সাক্ষ্যে বলেন, প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল মালিকানা কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। সংস্থাটির অভিযোগ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে কোম্পানির শেয়ার তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণ গোপন করার চেষ্টা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিটির মালিকানা তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল বলেও দাবি করেছে এনসিএ।
বিচারপতি কারেন স্টেইন তাঁর রায়ে বলেন, ফ্ল্যাটটি অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে কেনা হয়ে থাকতে পারে—এমন দাবি করার যথেষ্ট যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। এ কারণে সম্পত্তিটি বিক্রি বা হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি।
তবে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে সম্পত্তির দখল ফিরে পেতে মালিকপক্ষকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আদালতে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবীরা নিষেধাজ্ঞার আদেশের বিরোধিতা করেননি।
আনিসুজ্জামান চৌধুরী দাবি করেছেন, তিনি কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। সম্পত্তির মালিকানা গোপন করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কোনো দেওয়ানি মামলা করা হলে তিনি জোরালোভাবে তা মোকাবিলা করবেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলে সে ক্ষেত্রেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসে।
এনসিএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিদেশি সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের এনসিএ সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দের আদেশ পায়। পাশাপাশি তাঁর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করার জন্যও আদালতের আদেশ নেওয়া হয়।
আনিসুজ্জামান চৌধুরী তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে যুক্তরাজ্যের তদন্তকারী সংস্থাগুলো সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।