
সংগৃহীত ছবি
দেশের অর্থনীতিতে নানা চাপের মধ্যেও স্বস্তি দিচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানো এবং লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ। তবে রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস সৌদি আরবে সামরিক উত্তেজনা ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, শিল্পের শ্লথগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, আয় এবং দেশে অর্থ পাঠানোর ধারায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের ১৬ দশমিক ১৩ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে মোট রেমিট্যান্সে সৌদি আরবের অংশ বেড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ হয়েছে। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন তাঁরা।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, পরিস্থিতির কারণে রিয়াদ রুটে ফ্লাইট চলাচল ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হয়েছে। এই রুটে সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করে এয়ারলাইনসটি।
ইতিমধ্যে প্রায় ১১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ঢাকা ও রিয়াদ মিলিয়ে আট থেকে নয় হাজার যাত্রী পরিবহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হলেও সীমিত স্লটের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন লাখ ৩৩ হাজার ৪২৭ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে এক লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৬ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। অর্থাৎ, এ সময়ে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর অর্ধেকের বেশি দেশটিতে গেছেন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সংকটময় সময় পার করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাস আয় ও শ্রমবাজারেও নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বিকল্প শ্রমবাজার তৈরিতে সীমাবদ্ধতার কারণে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি তৈরি হয়েছে। সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সুযোগ ব্যাহত হলে রেমিট্যান্সে সরাসরি প্রভাব পড়বে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং প্রবাস আয়ের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মীদের আয় কমে যাওয়া, কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসা এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপ ও জাপানের মতো বিকল্প শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, রপ্তানি আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর।
সব মিলিয়ে, এক বছরে রেমিট্যান্সে ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা সেই অগ্রগতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।