দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই অবস্থানে সতর্ক হয়েছেন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দলটির নেতাকর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না—নেতাকর্মীদের প্রতি এমনই বার্তা দিচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, সংসদীয় দলের বৈঠকে দেওয়া নির্দেশনা এবং সাংগঠনিক পর্যায়ে নেওয়া পদক্ষেপে এ কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বিষয়ে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এর আগে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ইশরাক। রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করায় সেদিন থেকেই পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে তারেক রহমানের দেওয়া নির্দেশনাও দলীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ওই বৈঠকে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংসদ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু তৃণমূলের কর্মী নয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদেরও দলীয় শৃঙ্খলার আওতায় থাকতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা দেশবাসী সাদরে গ্রহণ করেছে। তাঁর নির্দেশনা বাস্তবায়নে দলের নেতাকর্মীরা সতর্ক রয়েছেন।
দলটির আরেক উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তারেক রহমান নেতাকর্মীদের সতর্ক করে আসছেন। এখন ব্যবস্থা নেওয়ার পালা। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাঁরা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন তাঁরা।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, সংগঠনের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব কিংবা শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়ে ন্যূনতম তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান জাফির তুহিনও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাঁরা দলীয়ভাবে তাঁর নীতি অনুসরণ করছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের ভাষ্য, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সাংগঠনিক পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই অবস্থান দলের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সারা দেশের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সতর্কতা বেড়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সাংগঠনিক পদক্ষেপও জোরদার করেছে বিএনপি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করার ঘোষণা আসে। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এসব সিদ্ধান্তের সময় রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল। কমিটি বিলুপ্তির আগের দিন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এসব পদক্ষেপের ফলে দলীয় পদে থাকা নেতাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সাংগঠনিক কমিটিগুলোর দায়িত্বও বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, দখল কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে—এমন ধারণা দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তারেক রহমানের অবস্থানের অন্যতম দিক হলো, জবাবদিহি শুধু সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের বৈঠকে দেওয়া নির্দেশনায় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল আচরণ, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিজ নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় নেতৃত্বের এই অবস্থান থেকে নেতাকর্মীদের কাছে বার্তা যাচ্ছে, পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব কাউকে অনিয়মের দায় থেকে রেহাই দেবে না।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর করাই এখন বিএনপির সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ জন্য নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সাংগঠনিক শাস্তি প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বিষয়ে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
ইশরাকের পদত্যাগের ফলে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ পূর্ণ মন্ত্রীর সংখ্যা ২৭ জন এবং প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ২৩ জন।