
সংগৃহীত ছবি
আরবি ‘বরকত’ শব্দের অর্থ প্রবৃদ্ধি, প্রাচুর্য, স্থায়ী কল্যাণ ও আল্লাহর অনুগ্রহ। তবে বরকত মানেই শুধু ধন-সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নয়। বরং অল্পতেই তৃপ্তি পাওয়া, সীমিত সময়ে বেশি কল্যাণকর কাজ করতে পারা এবং জীবনে স্থায়ী প্রশান্তি অনুভব করাও বরকতের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইসলামে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে কল্যাণময় করে তুলতে বরকতের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে এমন ১০টি আমল রয়েছে, যেগুলো জীবনে বরকত লাভের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
১. ইমান ও তাকওয়া অবলম্বন করা
জীবনে বরকত লাভের অন্যতম ভিত্তি হলো ইমান ও তাকওয়া। আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলা এবং পাপাচার থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মানুষ তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। পবিত্র কোরআনের সুরা আরাফের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করলে তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকত উন্মুক্ত করে দেওয়া হতো।
২. নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও অনুসরণ করা
পবিত্র কোরআন মানুষের জন্য হেদায়াত ও কল্যাণের উৎস। শুধু তিলাওয়াত নয়, এর শিক্ষা বোঝা এবং দৈনন্দিন জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। সুরা আনআমের ১৫৫ নম্বর আয়াতে কোরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে উল্লেখ করে এর অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত কোরআন পাঠ ও তার শিক্ষা চর্চা পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
৩. দিনের শুরুতে কর্মতৎপর হওয়া
দিনের প্রারম্ভিক সময়কে কাজে লাগানো বরকত লাভের আরেকটি মাধ্যম। অলসতা পরিহার করে ভোরে দিনের কাজ শুরু করলে সময়ের সদ্ব্যবহার ও কর্মদক্ষতা বাড়তে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের দিনের শুরুর সময়ে বরকতের জন্য দোয়া করেছেন। হাদিসটি সুনানে আবু দাউদে (হাদিস: ২৬০৬) বর্ণিত হয়েছে।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
পিতা-মাতা, পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখাকে জীবিকা বৃদ্ধি ও আয়ু দীর্ঘ হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারির ৫৯৮৬ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন।
৫. হালাল উপার্জন ও ব্যবসায় সততা বজায় রাখা
জীবনে বরকত লাভের জন্য উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম মেনে চলা এবং সততা বজায় রাখা জরুরি। ব্যবসায় পণ্যের গুণাগুণ ও ত্রুটি সম্পর্কে সত্য তথ্য দেওয়া ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থা তৈরি করে। সহিহ বুখারির ২০৭৯ নম্বর হাদিসে ক্রয়-বিক্রয়ে সত্য বলা এবং পণ্যের ত্রুটি প্রকাশ করার সঙ্গে বরকতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অসৎ উপার্জন মানুষের নৈতিকতা ও মানসিক প্রশান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৬. তওবা ও ইস্তিগফার করা
মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তাই নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সুরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়।
৭. দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তোলা
দান-সদকা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনে, তেমনি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি মাধ্যম। সুরা বাকারার ২৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করা এবং সদকাকে বৃদ্ধি করার কথা বলেছেন। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান করা এবং তা আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. আল্লাহর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
জীবনে ছোট-বড় যেকোনো প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা বরকত লাভের অন্যতম উপায়। কৃতজ্ঞতা মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং প্রাপ্ত নিয়ামতের মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়। সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি তার নিয়ামত বাড়িয়ে দেবেন।
৯. একসঙ্গে খাবার গ্রহণ করা
পরিবারের সদস্য কিংবা অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে খাবার গ্রহণ ইসলামী আদবের অংশ। একসঙ্গে খাওয়া পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়ায়। সুনানে ইবনে মাজাহর ৩২৮৭ নম্বর হাদিসে একত্রে আহার করা এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করার নির্দেশনা এসেছে। এভাবে খাবার গ্রহণে বরকত লাভের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
১০. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখা
জীবনের প্রতিটি কাজে যথাসাধ্য চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং বৈধ উপায়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। ইসলামী শিক্ষায় এই আস্থা মানুষের অন্তরে ধৈর্য, সাহস ও প্রশান্তি জোগায়।
বরকতময় জীবনের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক আমল
বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়ের সঠিক ব্যবহার, হালাল জীবিকা, পারিবারিক সম্প্রীতি, মানসিক প্রশান্তি ও কল্যাণকর কাজের মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটে। ইমান ও তাকওয়া অবলম্বন, কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দান-সদকা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মতো আমলগুলো নিয়মিত জীবনে ধারণ করার মাধ্যমে একজন মানুষ বরকতময় জীবনের পথে এগিয়ে যেতে পারেন।