
সংগৃহীত ছবি
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নজরদারি চালানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী দিতে পারেন কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নজরদারি চালানোর ঘোষণা একজন প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে দিতে পারেন কি না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে, নাকি দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এ ধরনের চর্চা তাঁকে শেখ হাসিনার শাসনামলের কথা মনে করিয়ে দেয় উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সরকার সেগুলো তদন্তে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর নজরদারিতে নিয়োজিত করা এবং নজরদারি প্রযুক্তির অপব্যবহারকে বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করে, যা নিন্দনীয়।
পোস্টে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর দাবি, এসব প্রকল্পে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও আন্তঃবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মতো প্রতিষ্ঠানকে সামনে রেখে পেছনে দলীয় নেতাদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
হাসনাতের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড প্রকল্পে সামরিক বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কার্ড তৈরির ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, বেসরকারি ব্যাংকের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিক কার্ড ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায় সরবরাহ করা হলেও ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ডের ক্ষেত্রে প্রতিটির ব্যয় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৬৫ টাকা ধরা হচ্ছে। এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি ডেটাবেজ তৈরির নামে ২ হাজার ১০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগকে অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা হিসেবে উল্লেখ করেন।
দেশের দরিদ্র মানুষের তথ্যভান্ডার তৈরির জন্য নতুন করে বড় প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিদ্যমান তথ্যভান্ডার, খানা জরিপ এবং মোবাইল ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস বিল ও মোবাইল রিচার্জের মতো তথ্য কাজে লাগিয়ে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের তথ্যভান্ডার আরও উন্নত করা সম্ভব।
তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্পের নামে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করে বিবিএসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা উচিত। কারণ, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দারিদ্র্যের তথ্যভান্ডার নিয়মিত হালনাগাদ রাখার দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
হাসনাতের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড প্রকল্পে অনিয়মের আশঙ্কা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবগত নন—এমনটি মনে করার কারণ নেই। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এসব কার্ডের প্রচার করছেন এবং বিরোধী দলকে এ নিয়ে সমালোচনা করছেন। এ অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে সম্ভাব্য অনিয়মের দায় তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পোস্টে শেখ হাসিনার শাসনামলে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার, গুম, ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ধরেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে কিছুটা সরে এসেছিল। কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্য আবারও বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাসনাত বলেন, রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করার অপচর্চা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাংলাদেশ আরেকটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কোনো সরকারি দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে কাজ করার জন্য গড়ে তোলা হয়নি; বরং সরকার, বিরোধী দলসহ দেশের সব নাগরিকের সেবা করাই তাদের দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে কোনো দলের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা জনগণের অর্পিত দায়িত্বের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।