
সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ যশোরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন তার বাবা-মা।
তাজমিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন তার মা-বাবা ও স্বজনেরা। সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’
মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার স্মৃতি তুলে ধরে কেয়া খাতুন বলেন, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাজমিনের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন মেয়ে বান্ধবীর বাড়িতে থাকার কথা জানিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে বলে। বান্ধবীর নাম এবং তার বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তাজমিনের মা ওই বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তেরও দাবি জানান।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। মেয়েকে হারিয়ে তিনিও ভেঙে পড়েছেন। তিনি জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়।
আবদুল আলীম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে সে আমাকে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। মেসেজে এসে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। এরপর লাইভ লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমিন তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল এবং বিভিন্ন ছুটিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
যেভাবে এগোচ্ছে তদন্ত
পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে।
এরপর পদুয়ার বাজার থেকে কীভাবে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার ধানখেতে পৌঁছায়, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা অটোরিকশা ধরে তদন্ত এগোচ্ছি।’
বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান জানান, তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।
এসপি আরও বলেন, ঘটনাস্থলের চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের অবস্থা দেখে তাঁর ধারণা, তাজমিন জীবন বাঁচাতে হামলাকারীদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সুমন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করেছে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শুক্রবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।