
সংগৃহীত ছবি
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রের দাবি, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত এক মাসে সারাদেশে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনেই গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার। রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জনকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে গত বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ৪৬৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন খান জ্যোতি, পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তা, তজুমদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুল তালুকদার এবং সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ধুবিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম ভোলা।
এ ছাড়া সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ রুহুল আমিন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের রেনু মিয়া, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মাজেদুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য অধ্যাপক আব্দুল বারিক এবং কেরানীগঞ্জ মডেল থানা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম সরকারসহ তৃণমূল পর্যায়ের আরও অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রেনু মিয়া হাতকড়া পরা অবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার পর প্রায় আট ঘণ্টা পর পুনরায় গ্রেপ্তার হন বলে জানা গেছে।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দুই দফায় ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার ও মামলার ঝুঁকি থাকায় এ ঘোষণা মূলত আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল হতে পারে। তাদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতার ওপরও নির্ভর করতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের আরেক অংশের মতে, শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি ভারতের জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে নিরাপত্তা ও আইনি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেবল মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং দেশের মাটিতে জীবনের শেষ সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষাও এ ঘোষণার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা উপযুক্ত সময়ে মাঠে নামলে সাঁড়াশি অভিযান দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমঝোতা ছাড়া দেশে ফেরার চেষ্টা এবং তা ঠেকাতে জোরপূর্বক প্রতিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হলে রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, শুধু পুলিশি শক্তি প্রয়োগ বা ব্যাপক গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মূল উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অন্যথায় অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারগুলোতে চাপ বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজধানীতে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, রাজধানীতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জনজীবন অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা বিন্দুমাত্র বরদাশত করা হবে না।