
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ আবারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি কমে গেছে। এতে এশিয়ায় গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং শীতের আগে ইউরোপের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এলএনজি সংগ্রহ আরও কঠিন হতে পারে। খবর দ্য ইকোনমিস্টের।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে কাতার ইউরোপের অন্যতম প্রধান বিকল্প সরবরাহকারী হয়ে উঠেছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত সেই সরবরাহ ব্যবস্থাকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর কাতার চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কাতার থেকে এলএনজি জাহাজের চালান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাজারে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন এলএনজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা গত বছর বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট এলএনজির প্রায় ৯ শতাংশ।
সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে এশিয়ার বাজারে পড়েছে। এ অঞ্চলে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। চলতি বছর এশিয়ার দেশগুলো এখন পর্যন্ত ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ লাখ টন কম।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে দেশে ইতোমধ্যে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শীতের আগে ইউরোপে মজুত নিয়ে উদ্বেগ
ইউরোপের গ্যাসের মজুত বর্তমানে ৭২ শতাংশ পূর্ণ। বছরের এই সময়ে এটি সর্বনিম্ন মাত্রা। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। জার্মানির মজুত আরও কম, মাত্র ৫৭ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিক্স ওয়ান কমোডিটিজ গত এক দশকের শীতের আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে সতর্ক করেছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইউরোপকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র শীত পড়লে ইউরোপে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। তখন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠতে পারে। শীত দীর্ঘ হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সরবরাহ নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চং বলেন, শীত তুলনামূলক কম হলে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউরোপ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তবে দুটি বিষয়ই অনিশ্চিত।
কাতারের বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব
কাতার এখনো তার এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্রগুলো পুরোপুরি চালু করেনি। দেশটির সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী শীতের আগে ইউরোপের মজুত পূরণে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে। এতে ২০২৭ সালজুড়েও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্প চালু হলে ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ববাজারে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেড়ে যেতে পারে। ফলে বর্তমান সংকটের পর ভবিষ্যতে এলএনজির দাম আবার কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজি বাজার তাই স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি, আর দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সরবরাহ ও মূল্যপতনের—দুই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।