বৃহস্পতিবার ● ৮ অক্টোবর ২০২৬ ● ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

শিরোনাম: মদিনায় যেসব স্থানে নামাজ পড়েছেন নবী কারিম (সা.)   ধর্ম-বর্ণ-পরিচয় নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী   বণিকদের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান আসাদুজ্জামান   ফিশারিঘাটে মাছ কিনতে নারীদের ভিড়, সভাপতি-বিএফডিসি ব্যবস্থাপকের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন   সামরিক ড্রোন রপ্তানির ৮৬ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দখলে   ডিসেম্বর ঘিরে নাশকতার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই: ডিবি প্রধান   প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের দোসররা ঘাপটি মেরে আছে: রিজভী   
বিদেশি সহায়তা কমায় অর্থায়ন সংকটে পড়তে পারে ২২০০ ছোট-মাঝারি এনজিও
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩২ পিএম   (ভিজিট : ১০৭)

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় অর্থায়ন সংকটের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং বিদেশি অনুদানের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল প্রায় ২ হাজার ২০০টি এনজিও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সংকট তৈরি হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন, জলবায়ু এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।

গবেষণায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিও নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

এক বছরে বিদেশি সহায়তা কমেছে ২৩ শতাংশ

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে, যা এক বছরে সহায়তা কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পতন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের সহায়তা বাজেট কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতিটিকে সাময়িক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশে এর পূর্ণ প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। কারণ আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব প্রকল্পে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা ইতোমধ্যে কমেছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে ২ হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৫৪টিতে। ফলে পুরোনো প্রকল্পগুলোর অর্থ শেষ হয়ে গেলে অর্থায়ন সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

অনুদাননির্ভর এনজিও বেশি ঝুঁকিতে

৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারছে। তবে অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস সীমিত। এ কারণে প্রায় ২ হাজার ২০০টি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অর্থায়ন সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব প্রথমে পড়তে পারে মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায়। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমানো বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এনজিওগুলোর দীর্ঘদিনের সেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি প্রকল্পে এনজিও যুক্ত করার প্রস্তাব

অর্থায়ন সংকট মোকাবিলায় চারটি বিকল্প পথের কথা বলেছে বিআইডিএস। এগুলো হলো—সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যবহার, সামাজিক ব্যবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।

গবেষকদের মতে, এসব বিকল্পের মধ্যে বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা সরকারেরই সবচেয়ে বেশি। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এ সুযোগ খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষণায় সরকার ও এনজিওর যৌথভাবে সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং মানুষকে সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এনজিওগুলোর। ফলে কিছু সেবা সরকার একা দেওয়ার পরিবর্তে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করলে ব্যয় কমার পাশাপাশি সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।

সিএসআরেও সংকোচন

বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ২০২৫ সালে কমে ৩৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে সিএসআর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

সামাজিক ব্যবসা ও নতুন ধরনের আর্থিক ব্যবস্থাকেও বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ছোট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে বন্ড বা ফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জামানত, ঋণপোর্টফোলিও ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।

যোগ্য এনজিওর তালিকার সুপারিশ

সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, সিএসআরসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা প্রণয়ন, ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের তাগিদ

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

গবেষকদের মতে, বিদেশি অনুদান কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদন কমে যাওয়ার প্রবণতা সামনে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হলে ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি প্রকল্প, দেশীয় অর্থায়ন, সিএসআর ও সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে এনজিও খাতে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।










  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]