
সংগৃহীত ছবি
২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে পথচলার শুরু। সেই হিসাবে নির্বাহী ক্ষমতায় তাঁর আড়াই দশক পূর্ণ হয়েছে। গত ২৫ বছরে ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় তাঁর প্রভাব নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিশ্লেষণ হয়েছে। এই দীর্ঘ শাসনামলে অর্জন, ব্যর্থতা ও পরিবর্তনের চিত্র নিয়ে চলছে আলোচনা।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নসহ বিভিন্ন বিশ্লেষণে মোদির শাসনামলের নানা দিক উঠে এসেছে। বিরোধীরা শুরু থেকেই তাঁর কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমালোচনা করে আসছেন। অন্যদিকে, সমর্থকদের কাছে তিনি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীক।
মোদির উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আলোচিত হয় ‘গুজরাট মডেল’। এ মডেলে শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ভারতের একটি বড় অংশে চরম দারিদ্র্য কমেছে বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া সরাসরি সরকারি সহায়তা, ডিজিটাল সেবার প্রসার এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগের কারণে সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে দীর্ঘ শাসনামলের সব অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চীনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীকে আধুনিক উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে এ রূপান্তরের গতি তুলনামূলক ধীর। গত ২৫ বছরে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বড় শিল্পকারখানা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব এখনো ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতির পাশাপাশি মোদির শাসনামলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এ সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করেন সমালোচকেরা। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, বিদ্বেষমূলক হামলা, মসজিদে আক্রমণ এবং সরকারি বুলডোজার দিয়ে মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের মতো ঘটনা দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সমালোচকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সরকারের কঠোর শাসনপদ্ধতির কারণে সমাজের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।
সব মিলিয়ে, গত ২৫ বছরে নরেন্দ্র মোদি ভারতের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সব সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশটির সামনে এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।