
সংগৃহীত ছবি
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে ছিল নবুয়তের সিলমোহর বা ‘মাহরুন নবুওয়ত’। বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল কবুতরের ডিমের মতো সামান্য উঁচু একটি গোশতপিণ্ড, যার মধ্যে লালচে আভা ও কিছু পশম ছিল। শেষ নবী হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিচয়ের অন্যতম নিদর্শন ছিল এই সিলমোহর। তাওরাত ও ইঞ্জিলেও শেষ নবীর নিদর্শন সম্পর্কে বিবরণ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নবুয়তের এই সিলমোহর অনুসন্ধানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহাবি হজরত সালমান আল-ফারসি (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। সত্যের সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি কীভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছেছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।
বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত সালমান আল-ফারসি (রা.) প্রথম জীবনে অগ্নিউপাসক ছিলেন। পরে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এক খ্রিস্টান পাদ্রীর কাছ থেকে তিনি শেষ নবীর আগমনের সংবাদ ও তাঁর বিশেষ তিনটি নিদর্শন সম্পর্কে জানতে পারেন।
পাদ্রী তাঁকে জানান, শেষ নবী সদকা গ্রহণ করবেন না, তবে উপহার গ্রহণ করবেন। আর তাঁর পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে থাকবে নবুয়তের সিলমোহর।
এই নিদর্শনগুলো জানার পর সত্যের সন্ধানে সালমান আল-ফারসি (রা.) মদিনায় আসেন। সেখানে তিনি ইহুদিদের একটি বাগানে কাজ শুরু করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শেষ নবীকে খুঁজে বের করা এবং তাঁর সম্পর্কে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে আসার পর সালমান আল-ফারসি (রা.) তাঁকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে তিনি কিছু খেজুর নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হাজির হন। খেজুরগুলো সদকা হিসেবে দেওয়ার কথা জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেগুলো গ্রহণ করে আসহাবে সুফফার দরিদ্র সাহাবিদের খেতে দেন। কিন্তু নিজে তা থেকে খাননি।
এ দৃশ্য দেখে সালমান আল-ফারসি (রা.) মনে মনে ভাবলেন, প্রথম নিদর্শনটি মিলে গেছে।
কিছুদিন পর তিনি আবার খেজুর নিয়ে হাজির হন। এবার সেগুলো উপহার হিসেবে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার হিসেবে দেওয়া খেজুর গ্রহণ করেন এবং নিজেও তা থেকে খান।
এবার সালমান আল-ফারসি (রা.) নিশ্চিত হন, দ্বিতীয় নিদর্শনটিও মিলে গেছে। এখন শুধু বাকি রয়েছে নবুয়তের সিলমোহর দেখা।
তৃতীয় নিদর্শনটি দেখার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সালমান আল-ফারসি (রা.)। একদিন এক সাহাবির জানাজা ও দাফনকাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উপস্থিত হন তিনি।
সেখানে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে অবস্থান করে তাঁর পিঠের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁর আচরণ দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি বুঝতে পারেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন লুঙ্গি ও চাদর পরিহিত ছিলেন। তিনি নিজেই চাদরটি সামান্য সরিয়ে দেন, যাতে সালমান আল-ফারসি (রা.) নবুয়তের সিলমোহর দেখতে পারেন।
সিলমোহরটি দেখামাত্র সালমান আল-ফারসি (রা.)-এর কাছে শেষ নবীর পরিচয় সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের অবসান ঘটে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জড়িয়ে ধরেন এবং কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
সত্যের সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সালমান আল-ফারসি (রা.)-এর এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে বিশ্বাস, ধৈর্য ও সত্য অনুসন্ধানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিজানুর রহমান আজহারীর ওয়াজ অবলম্বনে।