
সংগৃহীত ছবি
দরুদ শরিফ মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসেও নিয়মিত দরুদ পাঠের নানা ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে দরুদ শরিফ পাঠের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত তুলে ধরা হলো।
১. আল্লাহর নির্দেশ পালন
পবিত্র কোরআনের সুরা আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
আরবি:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও।
সুরা আহজাব, আয়াত ৫৬
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশিত একটি মর্যাদাপূর্ণ আমল।
২. আল্লাহর রহমত ও সওয়াব লাভ
দরুদ শরিফ পাঠের অন্যতম ফজিলত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সওয়াব লাভ।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮
তাই নিয়মিত দরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর রহমত ও বিশেষ প্রতিদান লাভের আশা করতে পারেন।
৩. দুশ্চিন্তা দূর ও গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ
দরুদ পাঠের সঙ্গে দুশ্চিন্তা দূর হওয়া ও গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদসংবলিত একটি হাদিস রয়েছে।
হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানান, নিজের দোয়ার একটি বড় অংশ তিনি দরুদ পাঠের জন্য নির্ধারণ করতে চান। তখন নবীজি (সা.) তাঁকে জানান, তিনি যদি আরও বেশি দরুদ পাঠ করেন, তাহলে তাঁর দুশ্চিন্তা দূর করা হবে এবং গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
জামে তিরমিজি, হাদিস ২৪৫৭
এ হাদিস মুসলমানদের বেশি বেশি দরুদ পাঠে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি জীবনের সমস্যা মোকাবিলায় দোয়ার সঙ্গে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. দোয়ার আগে দরুদ পাঠের গুরুত্ব
দোয়া করার সময় আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ আদবের অন্তর্ভুক্ত।
হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বক্তব্যে এসেছে, নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ না করা পর্যন্ত দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে অবস্থান করে।
জামে তিরমিজি
এ কারণে অনেক আলেম দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা, এরপর দরুদ পাঠ এবং দোয়ার শেষে আবার দরুদ পাঠ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
৫. কিয়ামতের দিন নবীজি (সা.)-এর নৈকট্য লাভ
আখিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ মুমিনদের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়। হাদিসে বেশি বেশি দরুদ পাঠকারীদের জন্য এ বিষয়ে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ৪৮৪
এ হাদিস নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং নিয়মিত দরুদ পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরে।
৬. নবীজি (সা.)-এর নাম শুনে দরুদ পাঠ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ আদব।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৪৬
তাই নবীজি (সা.)-এর নাম শুনলে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা উত্তম আমল।
কখন ও কীভাবে দরুদ পাঠ করবেন?
দিনের যেকোনো সময় দরুদ শরিফ পাঠ করা যায়। বিশেষ করে নামাজের শেষ বৈঠকে, দোয়ার সময় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে দরুদ পাঠের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
দরুদে ইবরাহিম দরুদ শরিফের একটি প্রসিদ্ধ রূপ, যা নামাজে পাঠ করা হয়। এ ছাড়া সংক্ষিপ্তভাবে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলেও নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম জানানো যায়।
দরুদ পাঠের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ করার চেয়ে আন্তরিকতা, নিয়মিত আমল এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা গুরুত্বপূর্ণ।
দরুদ শরিফ কেবল মুখে উচ্চারণ করার একটি আমল নয়; এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ফজিলত থেকে বোঝা যায়, নিয়মিত দরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর রহমত, সওয়াব এবং আখিরাতে নবীজি (সা.)-এর নৈকট্য লাভের আশা করতে পারেন।
তাই দৈনন্দিন জীবনে বেশি বেশি দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণকর।