
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলার সঙ্গে জড়িত।
গত ২৯ অক্টোবরের এ ঘটনাকে এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হিসেবে বিবেচনা করছে ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ১০টি ব্লকচেইনে থাকা বাইন্যান্সের বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর বেশির ভাগই স্থানান্তর করা হয় মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টিআরএম ল্যাবস উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলা চালিয়েছে। ব্লকচেইনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। হামলার কৌশল ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট অতীতের সাইবার হামলারও মিল রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী আরেক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও এ হামলার পেছনে ট্রেডারট্রেইটরের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা জোনাথন লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, বাইন্যান্সে প্রায় ৬৪০ কোটি ডলারের হামলাটি উত্তর কোরিয়ার এই হ্যাকার গোষ্ঠী চালিয়ে থাকতে পারে। আগের একটি হামলার সঙ্গে যোগসূত্রের ভিত্তিতে তারা এমন ধারণা করছেন। ডিপিআরকে বা ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম।
বাইন্যান্স ঘটনাটিকে জটিল নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে হ্যাকাররা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ পায়। পরে একটি সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে সম্পদ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী তদন্তে অনুপ্রবেশের আরও কয়েকটি সূত্র পাওয়া গেছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের কোনো ওয়ালেটের প্রাইভেট কি বা গোপন চাবি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
হামলার পর একাধিক ব্লকচেইনে লেনদেন ও অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় বাইন্যান্স। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ জমা বা ডিপোজিট কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। নিরাপত্তা যাচাই শেষে অর্থ উত্তোলন কার্যক্রমও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, চুরি হওয়া সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও উদ্ধারে ব্লকচেইন খাতের বিভিন্ন অংশীদার, সম্পদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে তারা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে নিজেদের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।
টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, হামলার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্লকচেইন অংশীদারের সহযোগিতায় প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। তবে চুরি হওয়া অর্থের বড় একটি অংশ এখনো হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। বাকি সম্পদের অবস্থান শনাক্ত ও সেগুলো উদ্ধারে কাজ করছেন বিশ্লেষকেরা।
উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট দুর্ধর্ষ হ্যাকার গোষ্ঠী লাজারাস গ্রুপের সঙ্গে ট্রেডারট্রেইটরের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে সাইবার হামলার পেছনেও উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ব্যঙ্গ করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ইন্টারভিউ’ মুক্তির প্রতিবাদে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর এক দশকের বেশি সময় পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইবিটে বড় ধরনের সাইবার হামলার জন্য ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। ওই হামলায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছিল।
টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, বাইন্যান্সে সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে বাইবিটসহ উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট আগের সাইবার হামলাগুলোর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বাইন্যান্স থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্পদের পরিমাণ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিটে সংঘটিত চুরির প্রায় চার গুণ।
বাইন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ বেশ কয়েকটি বড় ডিজিটাল মুদ্রার দাম কমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বড় একটি বিনিময় প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বড় অঙ্কের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়াও বাজারের দরপতনে ভূমিকা রাখে।
প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের এই চুরির ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণের ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।