
সংগৃহীত ছবি
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে ১৩ জন সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার দায়ে দণ্ডিত সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
বিবিসিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরল ঘটনা হতে পারে। তবে সাজা কার্যকরের বিরুদ্ধে আপিলপ্রক্রিয়া এবং অন্যান্য আইনি জটিলতা এখনো রয়েছে।
সম্প্রতি রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করব, যাতে মানুষ এটি দেখতে পারে। এটি প্রকাশ্যেই হবে।’ তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের অপরাধের পরিণতি কতটা গুরুতর, তা মানুষের বোঝা প্রয়োজন।
হেগসেথ জানান, সেনাসদস্যদের ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। চূড়ান্ত কোনো অনুরোধ করা হয়েছে কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। ৩ ডিসেম্বর তার সঙ্গে দেখা হবে।’
এর আগে সোমবার পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানিয়েছিলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুপারিশ করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে অনুমোদন দিয়েছেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর সচিব মঙ্গলবার জানান, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডে সাজা কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত তারিখের আগে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফোর্ট হুডে ২০০৯ সালের হামলা
২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলির ঘটনা ঘটে। সেখানে সেনাসদস্যরা সামরিক দায়িত্বে মোতায়েনের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওই সময়ের হামলায় ১৩ জন নিহত হন।
ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা নিডাল হাসান মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আদালতে তিনি স্বীকার করেন, ওই হামলায় তিনিই গুলি চালিয়েছিলেন। ঘটনাটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী অযুদ্ধকালীন হামলা হিসেবে পরিচিত।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে বিচার চলাকালে হাসান বলেন, আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। আদালতে নিজের কাজের জন্য ক্ষমাও চান তিনি।
সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আইনে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চতর আদালতে আপিল পর্যালোচনা এবং সাজা কার্যকরের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াও রয়েছে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের তারিখ ঘোষণার পরও আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হলে তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা জানানো হলেও কোন মাধ্যমে এটি দেখানো হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অধিকাংশই সহিংসতা, মৃত্যুর দৃশ্য ও অত্যন্ত গ্রাফিক কনটেন্ট প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
মেটা, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের নীতিমালায় এ ধরনের দৃশ্য প্রচারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। টিকটকও অত্যন্ত সহিংস বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে—এমন কনটেন্ট অনুমোদন করে না।
এক্সের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর দৃশ্যসংবলিত কনটেন্ট তাঁর পরিবার বা অনুমোদিত প্রতিনিধির অনুরোধে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ব্যবহারকারীদের সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের সুবিধা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রীয় মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সৈনিককে ফাঁসি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছিলেন। ভুক্তভোগীর পরিবার তাঁর উত্তরসূরি জন এফ. কেনেডির কাছে ক্ষমা চাইলেও সাজা কার্যকর করা হয়।
ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার দায়ে এডি স্লোভিক নামের এক মার্কিন সেনাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৭টি দেশে দুই হাজার সাত শর বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্যে ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ছয়টি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য পাওয়া যায়।
ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ডনীতির অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। ১৯৮৯ সালে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ধর্ষণ ও হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ তরুণের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে তিনি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। পরে ওই পাঁচজনই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ১৭ বছরের বিরতির পর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৩টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের জানুয়ারিতে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কেন্দ্রীয় মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন।
তবে নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং সম্প্রচারের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হওয়ার ওপর।