
সংগৃহীত ছবি
ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৪০৫ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে সেই পুঁজি নিয়েও জয় তুলে নিতে পারেনি ক্যারিবীয়রা। দুর্দান্ত রান তাড়ায় ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। তবু দলের পারফরম্যান্সে উন্নতির ছাপ দেখে সন্তুষ্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সোনালি সময়ের অন্যতম প্রতিনিধি স্যামি। তার নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে ক্যারিবীয়রা। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়ে যুক্ত হয়েও সাফল্য পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক এই অধিনায়ক।
স্যামির দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাদা বলের ক্রিকেটে বেশ কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা গেছে। সর্বশেষ ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে খেলেছে দলটি। এবার ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৪০০ রানের বেশি সংগ্রহ গড়েও জিততে না পারলেও দলের অগ্রগতিতে আশাবাদী কোচ।
ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডের আগে সংবাদ সম্মেলনে স্যামি বলেন, ‘ভারতে এসে শুনছেন, গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে কোনো সিরিজ জিততে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই সিরিজে ফল আমাদের পক্ষে আসেনি। তবে আমরা কিছু কিছু জায়গায় উন্নতি করছি। এই সফরের লক্ষ্য এবং আমার দলের জন্য সাফল্যের অর্থ কী, তা বিবেচনায় নিলে মনে করি, আমরা কিছুটা অগ্রগতি করতে পেরেছি। শুধু এখন নয়, সামগ্রিকভাবেও।’
নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তোলাকে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখেছিলেন স্যামি। তার ভাষ্য, গত আড়াই বছরে সেই লক্ষ্য পূরণে অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি যখন প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলকে নিজেদের জন্য দুর্গে পরিণত করা। গত আড়াই বছরে আমরা তা করতে পেরেছি। এ সময়ে খুব কম সিরিজেই আমরা হেরেছি। আমার কাছে নিজেদের মাঠে শক্তিশালী হয়ে ওঠাটাও সাফল্যের অংশ।’
দল হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন স্যামি। অনেক তারকা ক্রিকেটার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ব্যস্ত থাকায় জাতীয় দলকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাকে। তবে দলের সামর্থ্য ও উন্নতির দিকগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
স্যামি বলেন, ‘আমাদের ড্রেসিংরুমে কী আছে, একটি দল হিসেবে আমাদের কতটা প্রতিভা রয়েছে এবং আমরা কী হতে পারি, তা আমি বুঝি। তাই আমার কাছে সাফল্য মানেই সব সময় শীর্ষ দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় নয়। আন্তর্জাতিক দল হিসেবে আমরা কতটা এগোচ্ছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।’
ব্যাটিংয়ে ইতিবাচক মানসিকতা, স্ট্রাইক রোটেশন এবং স্পিনের বিপক্ষে ভালো খেলার উন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ। তিনি জানান, দলের ব্যাটারদের বড় ইনিংস খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক দুই ম্যাচে চারটি সেঞ্চুরি পাওয়াকে সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে ভারতের বিপক্ষে ৪০৫ রান করেও হারের পর ব্যাটিংয়ের শেষ দিকের ঘাটতি নিয়েও কথা বলেছেন স্যামি। তার মতে, উইকেট ও ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটারদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘উইকেটের পরিস্থিতি যদি বলে যে আমাদের ৪৫০ রান দরকার, তাহলে আমার মনে হয় ৪৭৫ করতে হবে। ভালো উইকেটে ৩০ ওভার শেষে ভালো অবস্থানে থাকলে সেখান থেকে বড় সংগ্রহের দিকে যেতে হবে। গৌহাটিতে ৩০ ওভারে আমাদের সংগ্রহ ছিল দুই উইকেটে ২৩০ রানের কিছু বেশি। সেখান থেকে ৪৫০ বা তার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু শেষ ১০ ওভারে আমরা ৭০ রানের কিছু বেশি করেছি।’
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৪০০ রানের বেশি সংগ্রহ নিয়েও ভারতকে আটকাতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্যামি বলেন, শুরুতে উইকেট তুলে নিয়ে চাপ তৈরি করা জরুরি ছিল। কিন্তু রোহিত শর্মা ও শুবমান গিলের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেই সুযোগ পায়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
স্যামির ভাষ্য, ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের হারাতে হলে পাওয়ারপ্লে ও মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট তুলে নিয়ে চাপ তৈরি করতে হবে। বড় সংগ্রহের ম্যাচে কখনো কখনো ব্যাটারদের কাছ থেকে ১০০ রানের বদলে ১৭০ রানের ইনিংসও প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নেমে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদি একটি উইকেটে ওভারপ্রতি আট রান ওঠে, তাহলে প্রতিপক্ষকে ওভারপ্রতি ৭.৫ রানের মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করতে হবে। অন্তত পার-স্কোরে নিয়ে আসতে হবে। তবেই নিজেদের জয়ের সুযোগ তৈরি হবে।’
এদিকে আর্থিক সংকটের কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ২৫ শতাংশ কমানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিষয়টি কঠিন হলেও বাস্তবতা মেনে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন স্যামি।
তিনি বলেন, ‘একজন পেশাদার হিসেবে সিরিজের আগে এমন কথা শুনতে চাইবেন না। তবে এটি আমার বা আপনাদের কাছে গোপন কিছু নয়। এ বছরের শুরুতে টেস্ট সিরিজ খেলতে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছিলাম। আমার মনে হয়, বোর্ড ও প্রশাসকদের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজতে হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ভালো না করলে সেটিকে টিকিয়ে রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করা এবং তাদের আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া সহজ হতো। কিন্তু এখন বাস্তবতা মেনে নিতে হচ্ছে।’
ভারতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শেষে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজও খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাকি ম্যাচগুলোতে নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিতে চান স্যামি।
তিনি বলেন, ‘ভারতের বিপক্ষে খেলার এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না। সেরা দলের বিপক্ষে জিততে পারলে পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও বাড়তি প্রভাব তৈরি করা যায়। ভারতের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স সব সময়ই বাড়তি অনুপ্রেরণা দেয়, যা ভবিষ্যতে কাজে লাগে। তাই আমরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। খেলোয়াড়েরা যেভাবে নিজেদের কাজে মনোযোগ ধরে রেখেছে, তার জন্য আমি তাদের প্রশংসা করি।’