
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক। তাঁর মৃত্যুর ৫৫ বছর পূর্ণ হলো আজ।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মেজর নাজমুল হক এক অনন্য বীরযোদ্ধার নাম। মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের এই সেক্টর কমান্ডার শুধু সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্বই দেননি, সংগঠিত করেছিলেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা এই বীর সেনানায়কের সমাধি রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে।
মেজর নাজমুল হকের ডাকনাম ছিল ‘টুলু’। তিনি ১৯৩৮ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমদ এবং মা জয়নাব বেগম।
কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে—বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)—দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর আর্টিলারি কোরে কমিশন লাভ করেন।
নওগাঁয় স্বাধীনতার পতাকা
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মেজর নাজমুল হকের সাহসী নেতৃত্ব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ তাঁকে নওগাঁয় ৭ ইপিআর উইংয়ের অধিনায়ক করে পাঠানো হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করলে পরদিন, ২৬ মার্চ, নওগাঁয় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন মেজর নাজমুল হক। নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলার অংশ হিসেবেও ঘোষণা করেন তিনি। স্থানীয় যুবকদের হাতে তুলে দেন অস্ত্র। স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের নিয়ে গড়ে তোলেন ইপিআর মুজাহিদ বাহিনী। সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে নওগাঁ ও বগুড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বগুড়া জেলা শত্রুমুক্ত করার অভিযানেও সাফল্য আসে।
২৮ মার্চ তাঁর বাহিনীর দ্বিমুখী আক্রমণের মুখে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ৭ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুরের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ৭ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মেজর নাজমুল হক। তরঙ্গপুর ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার।
এই সেক্টরে তিনি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেন সাধারণ তরুণদের, যাদের অধিকাংশই আগে কোনো প্রথাগত সামরিক প্রশিক্ষণ নেননি। প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এই সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরও তাঁর অধীনেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
দিনাজপুরের ধনধনিয়াপাড়ায় ১৮ জুন ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে মেজর নাজমুল হকের নেতৃত্বাধীন বাহিনী বিজয় অর্জন করে। ওই যুদ্ধে ১৪ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
বিজয়ের আগেই থেমে যায় জীবন
মুক্তিযুদ্ধ যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই আকস্মিকভাবে থেমে যায় মেজর নাজমুল হকের জীবন।
১৯৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মিত্রবাহিনীর সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। স্বাধীনতার জন্য যাঁর নেতৃত্বে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই বীর সেনানায়ক স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় দেখে যেতে পারেননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদের প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মেজর নাজমুল হক। তাঁর মৃত্যুর পর মেজর কাজী নুরুজ্জামানকে ৭ নম্বর সেক্টরের নতুন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিবগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর সাবেক কমান্ডার বজরুল রহমান সনু বলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, মেজর নাজমুল হক দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনার ছিলেন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তবে দুরভাগ্য তিনি স্বাধীনতার সুর্য দেখে যেতে পারেননি। তিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের লাল সুর্য। উনার অবদান অবিস্মরণীয় ও মনে রাখার মতো। তিনি স্বাধীনতা কামী গণমানুষের কাছে বেঁচে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।