চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই কৃতী সন্তান তাঁদের দীর্ঘদিনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে জেলার মানুষের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। শিবগঞ্জ উপজেলার তারাপুর গ্রামের কার্তিক পরামানিক প্রায় সাত দশক ধরে বৃক্ষরোপণ করে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন। আর ভোলাহাট উপজেলার মুশরীভূজা বটতলা গ্রামের মো. জিয়াউল হক দই বিক্রির আয় দিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই বিতরণ, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও অসহায় মানুষের সহায়তায় কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন। একজন পেয়েছেন ২০০৬ সালের কৃষি পদক, অন্যজন ২০২৪ সালের একুশে পদক। তাঁদের জীবন ও কাজ এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প।
কার্তিক পরামানিকের বৃক্ষপ্রেমের শুরু মাত্র ১০ বছর বয়সে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে চলার পথে বিস্তীর্ণ বালুচর ও ধুলার ঝড় দেখতেন তিনি। গাছপালা না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। বাবার কাছ থেকে গাছ লাগানোর উপকারিতা ও সওয়াবের কথা শুনে তাঁর মনে গাছ লাগানোর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে সেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বয়স এখন আশির কোঠা পেরিয়েছে। শরীরও আগের মতো সঙ্গ দেয় না। এর মধ্যে স্ত্রী গীতা রানী পরামানিকের মৃত্যুও তাঁকে শোকাহত করেছে। পরিবারের সদস্যরা বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিলেও বর্ষাকাল এলেই গাছের বীজ ও চারা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। রাস্তার পাশে, হাটবাজারে, ঈদগাহে, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার আশপাশে তাঁর হাতে লাগানো গাছ ছড়িয়ে রয়েছে।
প্রতিবছর শতাধিক গাছ লাগানো তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কোনো কোনো বছর তিনি ১৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত গাছ লাগিয়েছেন। মেহগনি, কড়ই, বাবলা, বট ও পাকুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন তিনি। শুধু চারা রোপণই নয়, নিজের নার্সারিতে চারা তৈরি করে সেগুলোও বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করেন।
২০০৩ সালের ২ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর বৃক্ষরোপণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাঁর কর্মকাণ্ড ব্যাপক পরিচিতি পায়। এরপর ২০০৬ সালে কৃষি পদক পান তিনি। পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কী চান। নিজের জন্য কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা না চেয়ে তিনি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে রাস্তা পাকা করার দাবি জানান।
তাঁর সেই দাবির পর ২০০৭ সালে মনাকষার হঠাৎপাড়া থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়। স্থানীয় মানুষের কাছে এটিও কার্তিক পরামানিকের অন্যতম বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া গোপালপুর ঘাটে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কার্তিক পরামানিকের বৃক্ষপ্রেম জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৩ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে ‘আ ম্যান হু লাভস ট্রিজ’ শিরোনামে তাঁকে নিয়ে একটি গল্প প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর বৃক্ষপ্রেমের গল্প জানতে পারে। তাঁর কাছে এই স্বীকৃতিকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে হয়েছে। কারণ তাঁর গল্প পড়ে শিক্ষার্থীরা গাছ লাগাতে উৎসাহিত হবে, এটাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
কার্তিক পরামানিকের ছোট ছেলে সনাতন পরামানিক দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে গাছ লাগানোর কাজে যুক্ত। বাবার ইচ্ছা, তিনি না থাকলেও যেন বৃক্ষরোপণের কাজ চালিয়ে যান। সনাতনও বাবার সেই ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ভোলাহাটের জিয়াউল হকের সমাজসেবার গল্পের শুরু নিজের বঞ্চনা থেকে। ১৯৫৫ সালে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর অর্থের অভাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে আর ভর্তি হতে পারেননি তিনি। তাঁর বাবা তৈয়ব আলী মোল্লা বাড়ি বাড়ি গরুর দুধ দোহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছেলের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় বই-খাতা ও ভর্তি খরচ জোগাড় করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
পড়াশোনা থেমে যাওয়ার পর বাবার কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে দই তৈরি ও বিক্রি শুরু করেন জিয়াউল হক। মাথায় দইয়ের ডালি কিংবা সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে দই বিক্রি করতেন। কিন্তু নিজের শিক্ষাজীবনের কষ্ট তিনি ভুলে যাননি। বরং সিদ্ধান্ত নেন, টাকার অভাবে যেন অন্য কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ না হয়।
১৯৬০ সাল থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বই দেওয়া শুরু করেন তিনি। দই বিক্রির আয় থেকে টাকা জমিয়ে পাঠ্যবই কেনার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধসহ নানা ধরনের বই সংগ্রহ করতে থাকেন। পরে নিজের বাড়ির একটি কক্ষে বই রাখার ব্যবস্থা করেন।
১৯৬৯ সালে নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জিয়াউল হক সাধারণ পাঠাগার’। সময়ের সঙ্গে পাঠাগারে হাজার হাজার বই জমা হয়। বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজারের বেশি বই সংগ্রহ করা হয়েছিল। জায়গার সংকটের কারণে পাঠাগারের কিছু বই আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারেও রাখা হয়েছে।
শুধু বই বিতরণ নয়, অসহায় মানুষের ঘর নির্মাণে সহায়তা, নলকূপ স্থাপন, খাদ্য ও পোশাক দেওয়া, এতিমদের সহযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই দেওয়া ও শিক্ষার্থীদের বেতন পরিশোধসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছেন জিয়াউল হক। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দশকে সমাজের কল্যাণে তিনি কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এর বড় একটি অংশ এসেছে তাঁর দই বিক্রির আয় থেকে।
তাঁর কাছ থেকে বই ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরে শিক্ষক, চাকরিজীবী ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভোলাহাটের পীরগাছি দারুস সুন্নাত দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মজিবুর রহমান এবং মুশরীভূজা ইউসুফ আলী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক আজিজুল হকও রয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, জিয়াউল হকের সহায়তা না পেলে অর্থের অভাবে তাঁদের পড়াশোনা থেমে যেতে পারত।
দই বিক্রেতা হিসেবে জিয়াউল হকের আলাদা পরিচিতিও রয়েছে। খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে তৈরি দই ও ক্ষীরের জন্য তাঁর সুনাম রয়েছে। ২০২৪ সালে একুশে পদকের জন্য তাঁর নাম ঘোষণার পরও জীবিকা থেমে থাকেনি। পরদিনও তাঁকে রহনপুর স্টেশন বাজারে দই ও ক্ষীর বিক্রি করতে দেখা যায়। শুভাকাঙ্ক্ষীরা যখন ফুল নিয়ে তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি জীবিকার প্রয়োজনে বাজারে ছিলেন।
সমাজসেবায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে সম্মাননা পান জিয়াউল হক। পরে ২০২৪ সালে সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি পাওয়ার পরও তাঁর জীবনযাপনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
একুশে পদকের অর্থ নিজের জন্য ব্যয় না করে পাঠাগারের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নিজের বাড়ির একটি কক্ষে পরিচালিত পাঠাগারে জায়গার সংকট রয়েছে। তাই আরও একটি ঘর নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার সুযোগ বাড়াতে চান তিনি।
দুই কৃতী সন্তানের জীবনের পথ আলাদা হলেও তাঁদের লক্ষ্য ছিল একই, নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য কিছু করা। কার্তিক পরামানিক নিজের জীবনের প্রায় সাত দশক গাছ লাগিয়ে মানুষের জন্য ছায়া ও পরিবেশের সবুজ রেখে যাচ্ছেন। আর জিয়াউল হক দই বিক্রির আয় দিয়ে দরিদ্র মানুষের হাতে বই তুলে দিয়ে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছেন, পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
একজনের হাতে ছিল গাছের বীজ ও চারা, অন্যজনের হাতে বই। একজনের লাগানো গাছ আজ পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে, পাখির আশ্রয় হয়েছে; অন্যজনের দেওয়া বই পড়ে বহু শিক্ষার্থী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের কাজের প্রভাব তাঁদের ব্যক্তিজীবনের সীমানা ছাড়িয়ে বহু মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই দুই কৃতী সন্তানের অর্জন তাই শুধু দুটি পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। কার্তিক পরামানিকের ৭০ বছরের বৃক্ষরোপণ আর জিয়াউল হকের দই বিক্রির অর্থে গড়ে ওঠা কয়েক দশকের সমাজসেবা, দুটি জীবনই প্রমাণ করে, বড় পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানুষের জন্য কিছু করার দৃঢ় ইচ্ছা।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. মোজাহারুল ইসলাম (তরু) বলেন, নবাবগঞ্জের দুজন কৃতি সন্তান, একুশে পদকপ্রাপ্ত গ্রন্থপ্রেমিক জনাব মো. জিয়াউল হক ও কৃষি পদকপ্রাপ্ত বৃক্ষপ্রেমিক জনাব কার্তিক প্রামাণিক তাঁদের দীর্ঘদিনের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করতে বড় কোনো পদ-পদবি বা সম্পদের প্রয়োজন হয় না। তাঁদের বৃক্ষরোপণ, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য গর্বের বিষয়। তাঁদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, কার্তিক পরামানিক ও মো. জিয়াউল হকের মতো মানুষ আমাদের জেলার গর্ব। একজন দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় এবং অন্যজন শিক্ষা ও মানবসেবায় যে অবদান রেখে চলেছেন, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। তাঁদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। এ ধরনের কৃতি মানুষের অবদান তুলে ধরার মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিবাচক অর্জন ও সম্ভাবনাগুলোও দেশবাসীর সামনে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।