শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিরোনাম: এতিমদের জন্য ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিলেন সায়েম সোবহান আনভীর   আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশকে আরও উন্নত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী   ডিজিটাল যুগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরি ও বইপাঠের সংগ্রাম   ‘গণঅভ্যুত্থান নিউটনের আপেল নয়, ১৭ বছরের আন্দোলনের ফসল:স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী    রাশিয়ার তেল কিনলেই বিপদ, ভারত-চীনের ওপর ১০০% শুল্কের পথ খুলল যুক্তরাষ্ট্র   ইরান যুদ্ধে শুধু আকাশ হামলা যথেষ্ট নয়, ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন মার্কিন শীর্ষ জেনারেল   বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক সোসাইটি ঢাকা মহানগর (উত্তর) কমিটির অনুমোদন   
স্মৃতির ধূলোয় ঢাকা ইতিহাস
ডিজিটাল যুগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরি ও বইপাঠের সংগ্রাম
শাহাজাদি
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৪:১০ পিএম   (ভিজিট : ৩৩)

​ঢাকা — পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ঘন ও জনবহুল গলির ঠিক ভেতরে—ঐতিহাসিক পাটুয়াটুলি মসজিদের বিপরীতে এবং প্রাচীন ব্রাহ্ম মন্দিরের কোল ঘেঁষে—নীরবে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ইতিহাস: রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি। সুমনা হাসপাতাল, ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের কোলাহলঘেঁষা এই স্থানটি আজ কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়, বরং এককালে যে পুরান ঢাকা ছিল সমাজসংস্কার, যুক্তিসঙ্গত চিন্তা ও সাহিত্যচর্চার মূল কেন্দ্র—এটি তারই এক প্রামাণ্য ইতিহাস।

​উনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঢাকার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি তৎকালীন 'ব্রাহ্মসমাজ' আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল, যা শিক্ষা, যুক্তি ও সমাজসংস্কারের আলো ছড়াতে মূল ভূমিকা পালন করে। রাজা রামমোহন রায়ের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরিটি তার সোনালী সময়ে পুরো বাংলার অন্যতম সেরা ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

​একসময় সাহিত্যের দিকপাল ও পন্ডিতদের নিত্য যাতায়াত ছিল এই নিভৃত লাইব্রেরিতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং কবি শামসুর রহমানের মতো মহান ব্যক্তিরা এখানে এসে প্রতিনিয়ত বই পড়া ও সাহিত্যচর্চায় মগ্ন হতেন। সে যুগে নতুন বই ও কালজয়ী সৃষ্টির ঘ্রাণ নিতে এবং মনের প্রশান্তি খুঁজে পেতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন এখানে।

​তবে অতীতের সেই সোনালী দিনের সাথে বর্তমান সময়ের বই পড়ার সংস্কৃতির ব্যবধান সুষ্পষ্ট। বর্তমান ঢাকায় একদিকে যেমন রয়েছে নীলক্ষেতের মতো বিশালাকার বইয়ের বাজার, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক সুবিধার নতুন নতুন লাইব্রেরিও গড়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও, এসব লাইব্রেরি ও বইয়ের দোকানে আগের মতো পাঠকদের উপস্থিতি আর চোখে পড়ে না।
​নীলক্ষেত ও পাটুয়াটুলীর গলিগুলোতে রাস্তার দুই পাশে বইয়ের চমৎকার পসরা সাজিয়ে বসে থাকেন বিক্রেতারা, কিন্তু প্রকৃত বইপ্রেমী বা পাঠকের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। বহু বছরের অভিজ্ঞ এক বই বিক্রেতা হতাশা প্রকাশ করে জানান, "ফুটপাতজুড়ে হাজারো বই সাজানো থাকে, কিন্তু হাতে তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখার মতো মানুষ এখন আগের মতো নেই। বই কেনা বা পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।"

​তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের হাত দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। ছাপা বইয়ের জায়গা দখল করেছে ই-বুক ও পিডিএফ (PDF)। ফলে নতুন বইয়ের পাতা উল্টানোর রোমাঞ্চ হারিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল পর্দার আড়ালে।

​ডিজিটাল দুনিয়ার রূপান্তর এবং শহুরে বাণিজ্যিকীকরণের ভিড়ে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরির মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো আজ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে। সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই লাইব্রেরিটি আজও এমন এক বাতিঘর, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই উজ্জ্বল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী গুণীজনদের কথা। এটি কেবল একটি পুরোনো লাইব্রেরি নয়, বরং আধুনিক প্রজন্মকে যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে পুনরায় বইয়ের পাতার মাঝে হারিয়ে যাওয়ার এক আকুল আহ্বান।

লেখক: ইংরেজি বিভাগ, অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী, উত্তরা ইউনিভার্সিটি









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]