
সংগৃহীত ছবি
প্রবল পাহাড়ি ঢল, কাদা-পাথরের স্রোত আর ঘুটঘুটে অন্ধকার—চারপাশে যেন মৃত্যুর হাতছানি। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেলে টানা নয় দিন বেঁচে থাকার পর জীবিত উদ্ধার হয়েছেন দুই কর্মী।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নেপালের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া দুজন হলেন যান্ত্রিক ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ এবং যান্ত্রিক সুপারভাইজার কবির মহারজন। টানেলের প্রায় ১৭০ মিটার ভেতর থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।
গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ত্রিশূলি নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জল, কাদা ও পাথরের স্রোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু শ্রমিক টানেলের ভেতরে আটকা পড়েন। প্রবল স্রোতের কারণে টানেলের প্রবেশপথও কাদা ও ধ্বংসাবশেষে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আটকা
উদ্ধারের পর সঞ্জয় সাহ জানান, বন্যার সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষে প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ জন ছিলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি সবাইকে দ্রুত বের হয়ে যেতে বলেন। অন্যদের নিরাপদে বের করে দিতে গিয়ে নিজের বের হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পাননি। শেষ পর্যন্ত তিনিই টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে যান।
এরপর শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন নয় দিন। বাইরে তখন উদ্ধারকারীরা তাদের খুঁজছেন, আর ভেতরে অন্ধকার, কাদা, সীমিত বাতাস ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটছিল দুই কর্মীর।
সঞ্জয় জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ সময়ে তিনি বারবার ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র’ জপ করছিলেন। মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়াই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
কণ্ঠস্বরেই মিলল জীবনের সন্ধান
নয় দিন পর শুক্রবার উদ্ধারকারীরা টানেলের গভীর ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এরপর তারা নিশ্চিত হন যে ভেতরে এখনও কেউ জীবিত থাকতে পারেন। সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় আরও জোরালো উদ্ধার অভিযান।
নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মিলে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে টানেলের ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি করেন। কাদা-পাথরের বিশাল স্তূপের কারণে অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
উদ্ধারকারীরা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ, পানি নিষ্কাশন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে আটকে থাকা অংশের দিকে এগিয়ে যান।
অবশেষে প্রথমে সঞ্জয় সাহকে এবং পরে কবির মহারজনকে টানেল থেকে বের করে আনা হয়। কাদা-মাটিতে পুরো শরীর ঢেকে থাকা অবস্থায় তাদের স্ট্রেচারে করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। ঘটনাস্থলে তখন উদ্ধারকারী ও উপস্থিত মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
উদ্ধারের পর দুজনকেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে বিমানে করে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়। তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও কবির মহারজনের হাত-পায়ে গুরুতর দুর্বলতা ও আঘাত রয়েছে। সঞ্জয়েরও চিকিৎসা প্রয়োজন হচ্ছে এবং অক্সিজেনের সহায়তা দেওয়া হয়।
দুই কর্মীর জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় নেপালের উদ্ধার অভিযানে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে এখনও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন। কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকারী দলগুলো এখন আরও জীবিত মানুষ উদ্ধারের আশায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
নয় দিন ধরে অন্ধকার ও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে দুই কর্মীর ফিরে আসার ঘটনাকে তাই নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে এক বিরল আশার আলো হিসেবেই দেখছেন উদ্ধারকারীরা।