শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬ ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

শিরোনাম: মাদক কারবারিদের নতুন তালিকায় বাদ পড়তে দৌড়ঝাঁপ জেলার শীর্ষ মাদক কারবারীদের   ২০৩০-এর মধ্যে সর্বজনীন আইনি পরিচয় নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ   নেপালে নিহতদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শোক, সহায়তায় প্রস্তুত বাংলাদেশ   তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সঠিক পথে হাঁটছি: এলজিআরডি মন্ত্রী   নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল, নিহত দেড় শতাধিক   বাংলাদেশের কাছে অপমানিত হয়েই অস্ট্রেলিয়া এমন পিচ বানিয়েছে: গাভাস্কার   রাকসুর জিএস আম্মারের দায় নেবে না শিবির   
২০৩০-এর মধ্যে সর্বজনীন আইনি পরিচয় নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:০৭ পিএম   (ভিজিট : ৯৩)

একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তার প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হলো জন্ম নিবন্ধন। একইভাবে, একজন মানুষের নাগরিক হিসেবে জীবনের সমাপ্তির আইনি দস্তাবেজ হলো মৃত্যু নিবন্ধন। কিন্তু বাংলাদেশ কি তার প্রতিটি নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যু সঠিকভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনতে পারছে? টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১৬.৯ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সকল নাগরিকের জন্য 'আইনি পরিচয়' নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা ঘনিয়ে আসলেও বর্তমান চিত্র বলছে, এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে এখনও পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। 

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। দেশে বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের হার ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার মাত্র ৪৭ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। অর্থাৎ, অর্ধেক জনগোষ্ঠীই সময়মতো নিবন্ধনের আওতায় আসছে না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক সূচকের সাথে তুলনা করলে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে জন্ম নিবন্ধনের বৈশ্বিক গড় প্রায় ৭৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। এই ধীরগতির নেপথ্যে বিদ্যমান নীতিগত দুর্বলতা, আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। 

এ বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধনের গতি থমকে থাকার প্রধান কারণ হলো 'জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪'-এর কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং এর মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের অভাব। বর্তমানে বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি শিশু কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বা হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু বিদ্যমান আইনি দুর্বলতার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি এই নিবন্ধন সম্পাদনে বাধ্য নয়। ফলে শিশুর জন্ম নিশ্চিত হওয়ার পরও অভিভাবকদের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। পাশাপাশি, অনলাইন পোর্টালের কারিগরি জটিলতা, তথ্যের ভুল সংশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন হওয়া এবং ফি সংক্রান্ত নানাবিধ ভোগান্তির কারণে সাধারণ মানুষ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। 

অন্যদিকে, জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে ভর্তি বা পাসপোর্ট তৈরির প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও উদ্যোগী হয়, কিন্তু মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। সম্পত্তি বণ্টন বা বিশেষ কোনো আইনি জটিলতা না উঠলে মানুষ মৃত্যু নিবন্ধন করতে চায় না। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল কাগজের একটি সনদ নয়। এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক সুবিধাগুলোর দরজা খুলে দেয়। একজন শিশু যখন নিবন্ধিত হয় না, তখন সে আইনের চোখে 'অদৃশ্য' থেকে যায়। এতে সে বাল্যবিয়াহ, শিশুশ্রম ও পাচারের ঝুঁকির মুখে পড়ে।

অন্যদিকে, সঠিক মৃত্যু নিবন্ধনের পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে সরকারের পক্ষে বাস্তবিক ও সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি দেশের কোথায়, কী কারণে এবং কোন বয়সে মানুষ মারা যাচ্ছে—সেই সুনির্দিষ্ট উপাত্ত না থাকলে সংক্রামক বা অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। একই সাথে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রক্রিয়ায় মৃত ব্যক্তির নাম সময়মতো তালিকা থেকে বাদ না পড়লে ভুয়া বা অনিয়মিত সুবিধাভোগীর সৃষ্টি হয়, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটায় এবং প্রকৃত দুস্থ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশ 'এসডিজি ১৬.৯' পূরণে ব্যর্থ হবে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশটির ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করবে।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে উত্তরণের পথ কি হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন আইনি পরিচয় নিশ্চিত করতে হলে এখনই আইন সংস্কারে হাত দিতে হবে। 'জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪' সংশোধন করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রত্যক্ষ আইনি দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। একই সাথে, গণমাধ্যম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের দ্বারা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে সবার মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রচার করতে হবে, বিশেষ করে নারীদের মৃত্যু নিবন্ধনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা দূর করতে হবে। ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, সহজ ও দ্রুত করতে হবে।

নাগরিকের আইনি পরিচয় সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। তবে এজন্য প্রয়োজন দ্রুত আইনি সংস্কার এবং মাঠপর্যায়ে এর কঠোর ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ কি সময়মতো এই যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেবে, নাকি একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে আইনি সুরক্ষার বাইরে রেখে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রায় পিছিয়ে পড়বে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]