
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন ও সহিংসতার মূখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ৯ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে কক্সবাজার উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবন যেমন অনিশ্চায়তায় আটকে আছে, তেমনি প্রত্যাবাসন নিয়েও তৈরী হয়নি কার্যকর কোন সমাধান। তারমধ্যেই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা
ইউএন এইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের কারণে আরও দুই লাখ এর অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই নিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। তবে নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদার্পূণভাবে ফিরে যাওয়াকেই এখনো একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখছেন রোহিঙ্গারা।
উল্লেখ-যে, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার প্রেক্ষিতে সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে দেশটির সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এতে দমন নিপীড়নের মুখে, প্রাণের ভয়ে ২৫ আগস্ট সীমান্ত অতিক্রম করে বানের স্রোতের মতো দলে দলে প্রবেশ করেছিল রোহিঙ্গারা। পরে মানবিক কারণে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয় সরকার। পরে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা তাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, অস্থায়ী বাসস্থান সহ নিরাপত্তা ব্যবসা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বসম্মানে স্বদেশে ফেরৎ পাঠাতে সরকার কুটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলোও এখনও পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও ফেরত নেইনি মিয়ানমার। আজকের এই দিনে গণহত্যার বিচার দাবি ও পূর্ণ নাগরিকত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চাই তারা---
স্হানীয়রা বলছেন, এখন রোহিঙ্গারা গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। পুরো জেলায় যেমন, ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েছে তেমনি, মাদকপাচার, গুম-খুন ও অপহরণে লিপ্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলার বারেটা বাজাচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত আতংকে আছে স্হানীয়রাও।
এদিকে, আশ্রয়শিবিরগুলোয় বর্তমানে মিয়ানমারের চারটি বড় সশস্ত্রগোষ্ঠীর পাশাপাশি পাঁচ-ছয়টি ছোট দল সক্রিয় রয়েছে। এদের মূল উদ্দেশ্য শিবিরের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় রাখা, ইয়াবা-আইস ও অস্ত্রের রুট সচল রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে ফায়দা লুটা।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোয় ৫ হাজার ৬০৩টি মামলায় ১৫ হাজার ১৩৭ রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু মামলার সংখ্যা বাড়লেও থামেনি রক্তপাত। পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে গত দুই বছরে তাদের মধ্যে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের কমান্ডারসহ অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছে।
৯ বছরে ২৯২ খুন ২০১৭ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ক্যাম্পের অপরাধের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে নেপথ্য সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার পর প্রথম এক বছরে ক্যাম্পে কিছুটা শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও পরের বছরে রোহিঙ্গা সশস্ত্রগোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সূত্রপাত ঘটে এবং ওই সময় খুন হয় ২৩ জন। ২০১৯ সালে মাদক ব্যবসা (বিশেষ করে ইয়াবা) এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার শুরু হলে খুনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২–এ।
২০২০ সালে করোনার সময়েও সন্ত্রাসী তৎপরতা থামেনি, ওই বছর খুন হয় ১৬ জন। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে আরসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা এবং ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ)’ চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ। এর পরদিনই একটি মাদ্রাসার ৬ শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ওই বছর মোট ৩০ জন প্রাণ হারায়।
২০২২ সালে চাঁদাবাজি ও অপহরণ ব্যাপক রূপ নিলে খুনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪। আর ২০২৩ সাল ছিল ক্যাম্পের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর—আরসা এবং আরএসওর মধ্যে ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে নিহত হয় ৮৩ জন। ২০২৪ সালে ২২, পরের বছর ৩০ এবং চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২–তে। সব মিলিয়ে গত ৯ বছরে সরকারি নথি অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২৯২।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, অনেক হত্যাকাণ্ডের পর ভয়ে বা দুর্গম পাহাড়ের আঁধারে মরদেহ লুকিয়ে ফেলার কারণে বহু গুম ও খুনের ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। প্রকৃত অর্থে গত ৯ বছরে খুনের শিকার মানুষের সংখ্যা ৩২৫ ছাড়িয়ে যাবে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আশ্রয়শিবিরে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীদের টার্গেট কিলিং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সন্ত্রাসীদের দমনে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান। প্রায় প্রতিদিনই অস্ত্রসহ সন্ত্রাসীরা ধরা পড়ছে। তবে যত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ মাতৃভূমি রাখাইনে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না যাবে, তত দিন এ সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে না।