অন্যান্য যে কোনো দেশের তুলনায় সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসাও করছেন অনেকে। সেই সুবাদে অনেকেই পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে উল্টো নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন অসংখ্য বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে কারও আকামা (বৈধ বসবাসের অনুমতিপত্র) নেই, কারও কাজ থাকলেও বেতন নেই। এ ছাড়া আকামা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়ার পর উধাও হয়ে যাচ্ছেন নিয়োগকর্তা বা স্পনসর। আবার বৈধ কাগজপত্র না থাকায় পুলিশের হাতে আটক হয়ে মাসের পর মাস থাকছেন কারাগারে। সেখান থেকে দেশে ফিরতেও পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি।
দীর্ঘদিন জেল খেটে সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের এসভি-৮০২ ফ্লাইটে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশে ফিরেছেন বহু প্রবাসী। তাদের মধ্যে দুলাল মিয়া, আব্দুল হালিম, আল আমিন ও দিদারুল আলমের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের।
তারা জানান, ১০৪ জন সৌদি আরবে জেল খেটে দেশে ফিরেছেন।
ফেরত আসা প্রবাসীদের অভিযোগ, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পর্যাপ্ত তৎপরতার অভাবে আটক বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকছেন। অথচ পাকিস্তান ও ভারতের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা নিয়মিত কারাগারে গিয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের শনাক্ত ও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা মাসের পর মাসেও একবার খোঁজ নিতে না যাওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।
দেশে ফেরা নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার বাসিন্দা দুলাল মিয়া ১৩ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। তার অভিযোগ, অন্যের কাছে একটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছিলেন। ওই কক্ষে ভাড়াটিয়া মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরে ওই কক্ষের মালিক হিসেবে দুলালকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান তিনি। কিন্তু মুক্তির মাত্র ২৮ দিনের মাথায় আবারও আটক হন।
দুলাল বলেন, ‘আমি কোনো অপরাধ করিনি। একজন দেশির কাছে রুম ভাড়া দিয়েছিলাম। তিনি রুমে কী করেছেন, তা আমি জানতাম না। কিন্তু তার অপরাধে আমাকে জেলে যেতে হয়েছে। ১৩ মাস জেল খেটে বাইরে এসে দেখি আমার কিছুই নেই। ব্যবসা, পাসপোর্ট, এমআর—সব হারিয়েছি। এক বছরে প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।’
তিনি জানান, তার আকামার মেয়াদ সাত মাস থাকলেও আকামাসংক্রান্ত জটিলতায় আবারও আটক হন। দেশে ফেরার আগে নিজের কক্ষে থাকা ১০ হাজার টাকাও উদ্ধার করতে পারেননি। তার অভিযোগ, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা প্রায় দুই মাস পর কারাগারে গিয়েছিলেন। তখন টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, ওই টাকা ফেরত পাওয়ার আশা না করাই ভালো।
১৩ বছর প্রবাসজীবন শেষে দুই সন্তান, মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কিছুই নিয়ে যেতে পারছেন না বলে আক্ষেপ করেন দুলাল। তার ভাষায়, আজ বাড়িতে খালি হাতে ফিরছি। অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। পরিবারকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকা মোহাম্মদ আব্দুল হালিম। তার অভিযোগ, আকামাসংক্রান্ত জটিলতায় আটক হওয়ার পর তাকে প্রথমে তিন দিন থানায় রাখা হয়। পরে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় আড়াই মাস কাটাতে হয়েছে।
আব্দুল হালিম জানান, কোভিডের সময় তাদের আকামাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ওমরাহ করতে গিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে। তার পাসপোর্টও ছিল না।
তিনি বলেন, আমাদের শনাক্ত করতে দূতাবাসের লোকজন না আসায় দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এগোয়নি। পাকিস্তান ও ভারতের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা ১৫ দিন পরপর বা মাসে একাধিকবার কারাগারে যান। কিন্তু বাংলাদেশের দূতাবাসের লোকজন দুই মাসেও আসেননি। এ কারণে আমাদের আরও বেশিদিন জেলে থাকতে হয়েছে।
সৌদি আরবে বর্তমান শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আব্দুল হালিম। তার দাবি, অনেক কর্মী তিন মাসের আকামা নিয়ে দেশটিতে যাচ্ছেন। কিন্তু ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কাজ বা আকামা নবায়ন নিয়ে সংকটে পড়ছেন। কেউ কেউ চার লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেও পর্যাপ্ত সময়ের বৈধ আকামা পাচ্ছেন না। আবার নিয়োগকর্তা বা স্পনসর আকামা করে না দেওয়ায় কাজ করার সুযোগও হারাচ্ছেন তারা।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা মো. আল আমিনের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিন বছর সৌদি আরবে থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারেননি তিনি। কাজ করেও ঠিকমতো বেতন পাননি। আকামা না থাকায় কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। পরে বাড়ি থেকে টাকা পাঠিয়ে আকামা করার চেষ্টা করেও সফল হননি।
আল আমিন বলেন, ‘তিন বছর কষ্ট করে কাজ করেছি। ঠিকমতো বেতন পাইনি। আকামা ছিল না, কাজও করতে পারিনি। বাড়ি থেকে টাকা পাঠিয়ে আকামা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এখন দেশে ফিরছি, পরিবার কান্নাকাটি করছে। আমাদের মতো যারা জেলে আছেন, তাদের খোঁজ নিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজন নিয়মিত গেলে এত কষ্ট হতো না।’