
একসময় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার বান্ডিল হাতে ছুটতেন হকাররা। চায়ের দোকান, বাজার কিংবা বাড়ির দরজায় তাঁদের অপেক্ষায় থাকতেন পাঠকেরা। দেশ-বিদেশের খবর জানতে সকালে ছাপা সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখতেন অনেকে। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন মুঠোফোনে কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যাচ্ছে সর্বশেষ খবর। ফলে ছাপা পত্রিকার প্রতি আগ্রহ কমছে, কমছে বিক্রিও। এর প্রভাব পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র বিক্রেতাদের জীবিকায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত আব্দুল কাদের বলেন বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বয়স বাড়লেও অনেককে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন পত্রিকার বান্ডিল হাতে পথে নামতে হচ্ছে। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পেশা বদলানোর সুযোগও সীমিত। একসময় যে পেশা দিয়ে সংসার চলত, সেই পেশা এখন অনেকের কাছে অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার প্রবীণ সংবাদপত্র বিক্রেত দ্বীলিপ কুমার বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় না দিলেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোরে পত্রিকার বান্ডিল হাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় তাঁর পত্রিকা বিলির কাজ। এক পাঠক থেকে আরেক পাঠকের কাছে হেঁটে পৌঁছে দেন প্রতিদিনের খবর। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটে পত্রিকা বিলি করতে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার হাঁটতে হয় তাঁকে। এভাবেই দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে পত্রিকা বিলির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। বয়স বাড়লেও থেমে নেই তাঁর পথচলা। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই ছুটে চলেন পাঠকের দুয়ারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার বিভিন্ন বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকায় সংবাদপত্র বিক্রেতারা স্থানীয় পাঠকদের কাছে প্রতিদিন পত্রিকা পৌঁছে দেন। তবে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে বদলে গেছে মানুষের খবর পড়ার অভ্যাস। আগে কোনো ঘটনা জানতে পরদিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হতো, এখন স্মার্টফোনেই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে দেশ-বিদেশের খবর। অনেকেই শুধু শিরোনাম, সংক্ষিপ্ত সংবাদ কিংবা ভিডিও দেখেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন। ফলে কমছে ছাপা পত্রিকার পাঠক ও বিক্রি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংবাদপত্র বিক্রেতাদের আয় ও জীবিকায়।
সাংবাদিক আব্দুর রব নাহিদ বলেন পরিবর্তিত অভ্যাসের প্রভাব পড়ছে ছাপা পত্রিকার বাজারে, বিক্রি কমলে বিক্রেতাদের আয়ও কমে গেছে। অথচ পত্রিকা সংগ্রহ, পরিবহন ও পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজগুলো করতে তাঁদের প্রতিদিনই সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। বিক্রির পরিমাণ কমে গেলে সেই শ্রমের তুলনায় আয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কমিশনের ভিত্তিতে পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন সংবাদপত্র বিক্রেতা মো.ইসমাইল হোসেন বলেন তিনি ব্যবসার শুরুর দিকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ কপি পত্রিকা বিলি করতেন। তখন তাঁর দৈনিক আয় ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। দুই দশক পর পাঠকের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বাড়ে। সে সময় মাসে আয় হতো ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তবে সময়ের সঙ্গে ছাপা পত্রিকার পাঠক কমে যাওয়ায় এখন প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ কপি পত্রিকা বিলি করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর মাসিক গড় আয় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা, যা আগের তুলনায় কম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সংবাদপত্র বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একসময় প্রতিদিন প্রচুর পত্রিকা বিক্রি হতো। সকালে পত্রিকা নিয়ে বের হলে দ্রুতই বান্ডিল শেষ হয়ে যেত। এখন অনলাইনে খবর পড়ার প্রবণতা বাড়ায় কমেছে পত্রিকার বিক্রি, কমেছে আয়ও। ফলে আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় থাকলেও বয়স বাড়ায় প্রতিদিন হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই এ পেশায় রয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র বিক্রেতাদের কাছে এখন তাই শুধু পত্রিকা বিক্রির হিসাব নয়, বরং পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা এবং জীবিকার বিকল্প খুঁজে পাওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।