শুক্রবার ● ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ● ৭ কার্তিক ১৪৩৩

শিরোনাম: সখিপুর প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে চা-আড্ডায় এয়ার কমোডর আবু রায়হান   বেশি মানুষ উঠলেই দুলতে থাকে কাঠের পুল!   চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল   সংরক্ষিত নারী আসনের এগিয়ে আশিফা আশরাফী পাপিয়া   ঝিকরগাছায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত    বল্লায় জীয়ন মেডিকেল সার্ভিসেসের রজতজয়ন্তী ও নতুন ভবনের উদ্বোধন   প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগেই ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হলো রাষ্ট্রদূতকে   
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থামছে না
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল
৩৪ মাসে সড়কে ঝরেছে ১৫০ প্রাণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৫ এএম   (ভিজিট : ৭৯)

বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।  সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর থাকার পরও জেলার মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের চলাচল, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং তদারকির ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪ মাসে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন। এর মধ্যে সোনামসজিদ মহাসড়ক অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক।

সড়ক দুর্ঘটনার এই চিত্রের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জেলায় পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। তবে দিবসটি ঘিরে নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো এবং দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৮ জন, ২০২৫ সালে ৪০ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ ৩৪ মাসে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫০। এসব দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোটরসাইকেল আরোহী রয়েছেন।

জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর একটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক। এই পথে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকের পাশাপাশি বাস, মাইক্রোবাস অটো,, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। একই সঙ্গে অটোরিকশা, ভটভটি ও নসিমনের মতো যানবাহনের চলাচলও রয়েছে। ভারী যানবাহনের চাপ, গতির প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন ধরনের যান একই সড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।

মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও দুর্ঘটনা বন্ধ হয়নি।

জেলার সড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অনুমোদনহীন পরিবহনের চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে সোনামসজিদ স্থলবন্দরমুখী সড়কে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ এবং বিপজ্জনকভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে চলাচলকারী ভটভটি, নসিমন ও অটোরিকশার সঙ্গে দ্রুতগতির যানবাহনের সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।

কিছু যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফিটনেস সনদ নেই। অনেক চালক ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালান। মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার ঘটনাও দেখা যায়। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন বলে মনে করছেন তাঁরা।

গত ১৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক দিনেই পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কে দুটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চারজন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট-চৌডালা সড়কের পুসকুনি এলাকায় ভটভটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। নাচোলের সোনাইচণ্ডী হাটে গরু বিক্রি করে ওই ভটভটিতে বাড়ি ফিরছিলেন কয়েকজন। দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলেসহ তিনজন নিহত হন এবং আরও আটজন আহত হন।

এ ছাড়া গত ২১ অক্টোবর শিবগঞ্জ উপজেলায় গরুবোঝাই একটি ভটভটি উল্টে দুজন গুরুতর আহত হন। তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এসব ঘটনা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে গরু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ভটভটির মতো যানবাহনে যাত্রী বহন, অতিরিক্ত বোঝা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি দুর্ঘটনার পরিণতি আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ছাড়া অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন নেই। অথচ জেলায় অন্তত ৩০টি বেসরকারি ড্রাইভিং স্কুল কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালায় নির্ধারিত সময় ধরে ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি ট্রাফিক আইন, সড়কের চিহ্ন, সংকেত এবং যানবাহনের কারিগরি বিষয় শেখানোর কথা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করা হচ্ছে। এতে চালকেরা সড়কের নিয়ম, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় কিংবা গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি মোকাবিলার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা শফিফুল ইসলাম বলেন, ৩০ দিনের প্রশিক্ষণের কথা বলে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সাত থেকে ১০ দিন গাড়ি চালানো শেখানোর পরই কোর্স শেষ বলে জানানো হয়। তাঁর অভিযোগ, ট্রাফিক সংকেত ও আইন সম্পর্কে কোনো ক্লাস নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহজামাল হক বলেন, টিটিসি ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ছাড়া জেলায় অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং স্কুলের বৈধ অনুমোদন নেই। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি সাধারণ মানুষকে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আহ্বান জানান।

জেলার গ্রামীণ সড়কগুলোতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যাটারিচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন চালানোর প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে কেউ কেউ অল্প বয়সেই উপার্জনের জন্য চালকের আসনে বসছে। আবার কিছু কিশোর পড়াশোনার পাশাপাশি কিংবা পড়াশোনা ছেড়ে যানবাহন চালাচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তাদের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, অনেক শিক্ষার্থী নিয়ম না মেনে মোটরসাইকেল নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের মধ্যে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো ও নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের প্রবণতাও দেখা যায়। নিষেধ করার পরও অনেকে সতর্ক হচ্ছে না। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি সাদ হোসেন মুজাহিদ বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, চালকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা জরুরি।

রহনপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মাহতাব উদ্দিন বলেন, অবৈধ যানবাহনের আধিক্য, অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কেলের বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালক, গাড়ির মালিক ও পথচারী, সবার দায়িত্ব রয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে। সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়। বৈধ চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নির্ধারিত গতিসীমা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার মতো বিষয়গুলো এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]