| শিরোনাম: |
সোহেল রানার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ অনুবিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব আফরিন হক ও কল্যাণ বিভাগের পরিচালক লোকমান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের সহযোগিতায় আশার আলো দেখছে শোকাহত পরিবার।
বৈধ পথে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে লাটভিয়ায় নিয়ে যাওয়া সোহেল রানার মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও উদ্বেগের মধ্যে পড়ে তাঁর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, দালালচক্রের অমানবিক নির্যাতন ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়ে গত ৮ অক্টোবর লাটভিয়ার একটি জঙ্গলে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও ৯ ও ১০ অক্টোবর পরিবারের কাছে টাকা দাবি এবং নির্যাতনের ভিডিও পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ওই চক্রের বিরুদ্ধে।
সোহেল রানার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা। বিদেশের মাটিতে প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে নিজস্ব ঠিকানায় দাফন করতে না পারার আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান।
এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ অনুবিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব আফরিন হক এবং কল্যাণ বিভাগের পরিচালক লোকমান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়। পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেল রানার অবস্থান ও মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাঁরা লাটভিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের তৎপরতায় ১২ অক্টোবর পরিবার জানতে পারে, সোহেল রানা ৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেছেন।
এদিকে, লাটভিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মরদেহ গ্রহণ ও দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী সেখানেই দাফন করার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন ছিল। এ অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা, যোগাযোগ ও সমন্বয় পরিবারকে আশার আলো দেখায়। ছুটির দিনেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিবারের ফোন রিসিভ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
সোহেল রানার স্ত্রী ও দুই সন্তানের আকুতি ছিল একটাই তাঁদের প্রিয় মানুষটির মরদেহ যেন দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। সন্তানরা যেন বাবার কবরের ঠিকানা নিজেদের দেশে খুঁজে পায়। এই আকুতির পাশে দাঁড়িয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা শোকাহত পরিবারটির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
একজন প্রবাসীর মৃত্যু কোনোভাবেই তাঁর পরিবারের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তবে সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের পাশে পাওয়া অসহায় পরিবারের জন্য বড় ভরসা হয়ে ওঠে।
সোহেল রানার মৃত্যুর ঘটনায় দালালচক্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাত্রা করা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানব পাচার ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
সোহেল রানার মর্মান্তিক পরিণতি যেমন অবৈধ অভিবাসন ও দালালচক্রের প্রতারণার ভয়াবহতা সামনে এনেছে, তেমনি তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতা মানবিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্বও তুলে ধরেছে।
এমন বাংলাদেশই প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ যে বাংলাদেশ বিপদে পড়া নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়, বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করা মানুষের শেষ বিদায়টুকু মর্যাদার সঙ্গে নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকে এবং শোকাহত পরিবারের পাশে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেয়।