
সংগৃহীত ছবি
দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। লোকসানে থাকা এসব ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। একই সময়ে তারল্যসংকট মোকাবিলায় চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা জরুরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার (৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সময় ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন কমিটির সদস্যরা। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে নিট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এ সময় সম্পদের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং মূলধনের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ ছিল।
লোকসানে ২২ ব্যাংক
লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হলো—জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক দুটি হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর লোকসানের পেছনে উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমানকে দায়ী করা হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর আয়ক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে পরিচালন মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ঋণজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট লোকসানে পড়ছে।
১২ ব্যাংককে ৮৪ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে ১২টি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা বা ডিমান্ড লোন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এ সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি ১৬ লাখ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট শেষে নগদ অর্থ ও সরকারি সিকিউরিটিজসহ ব্যাংক ব্যবস্থার মোট তরল সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ১ লাখ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংক খাতে এ তরল সম্পদের বণ্টন সমান নয়। অধিকাংশ প্রচলিত ধারার ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও কিছু প্রচলিত ধারার ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি রয়েছে। মোট তরল সম্পদের বড় অংশই সরকারি সিকিউরিটিজ, অর্থাৎ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা
চলতি বছরের ৩০ জুন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। ৩১ মার্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে—এমন ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার কমাতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল আলম। তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দলের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করতে পারবে না।
সূত্র জানায়, বৈঠকে এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ অর্থঋণ আদালত ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। প্রয়োজনে পৃথক বেঞ্চ গঠনের কথাও বলেন তিনি।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মূল ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাদের নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান তিনি।
কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান কিরন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)।