
এআই জেনারেটেড ছবি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো প্রথম হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তার ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনি। হামলায় আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই হাসপাতালেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী বোমা হামলা চালালে তাকে ফের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করতে হয়।
চলতি সপ্তাহে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘আল আরাবি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন দাবি করেছেন ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের (বিশেষজ্ঞ পরিষদ) সদস্য মহসেন হায়দারি।
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আলী খামেনির প্রধান বাসভবনে হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সূচনা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী তেহরানের অন্তত তিনটি হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করে।
মহসেন হায়দারি বলেন, “তিনি (মোজতবা) আহত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও তেহরানের তিনটি হাসপাতালে হামলা চালানো হয়। মোজতবা খামেনি তৃতীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হামলার পর তাকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টেনে বের করা হয়।”
হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের পর মোজতবা খামেনিকে অজ্ঞাত একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তাকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি। এমনকি তার কোনো বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসেনি।
এমন পরিস্থিতিতে গত ৮ মার্চ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার নাম ঘোষণার আগপর্যন্ত মোজতবা খামেনি নিজেও জানতেন না যে তাকে দেশের সর্বোচ্চ পদে মনোনীত করা হয়েছে বলে দাবি করেন হায়দারি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোষণার পর দেশীয় আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুসারে দায়িত্ব গ্রহণ করা তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কোমে অবস্থিত সংস্থাটির সচিবালয়ে বোমা হামলায় আটজন নিহত হন। একই সঙ্গে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও সুপারিশও ধ্বংস হয়ে যায়।
এর ফলে প্রথম দফার বিমান হামলার এক সপ্তাহ পর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যদের অত্যন্ত গোপনে একটি বিশেষ কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সভার স্থান ও উদ্দেশ্য আগে থেকে জানানো হয়নি। সেখানে সদস্যদের পৃথক ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে বলা হয়।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রয়াত খামেনির ছেলেকে যেন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা না হয়। ট্রাম্পের ভাষ্য ছিল, মোজতবা তার বাবার চেয়েও বেশি কঠোর ও গোঁড়া অবস্থানের অনুসারী। তবে ওই হুমকি উপেক্ষা করেই ভোটাভুটিতে মহসেন হায়দারি প্রথম মোজতবা খামেনির নাম প্রস্তাব করেন বলে জানান তিনি।
হায়দারি বলেন, “শত্রুর হুমকি ও অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ছাড়া আর কাউকেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বেছে নেব না।”
তিনি আরও দাবি করেন, “মোজতবা খামেনির সুস্থতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছি। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতাসহ নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত তিনি পূরণ করেছেন।”
গোপন ওই ভোটাভুটিতে মোট ৫৯টি ভোটের মধ্যে ৫০টি ভোট পান মোজতবা খামেনি। অপর প্রার্থী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি পান ৮ ভোট। পরিষদের একজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে মোজতবা খামেনি ইরানের প্রশাসনে সরাসরি কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক পদে ছিলেন না। তবে তিনি তার বাবার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাক্ষাৎকারে হায়দারি তাকে ‘ম্যান অব দ্য শ্যাডো’ বা নেপথ্যের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে গত কয়েক মাস ধরে মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকা নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তার মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ বিকৃত হয়ে গেছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না তিনি মারা গেছেন। তবে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। তার শরীরের বাম পাশ, হাত ও পা—পুরোটাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।”
তবে চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব দাবি নাকচ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দাবি করেন, জনসম্মুখের আড়ালে থাকা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি “সম্পূর্ণ সুস্থ” আছেন।