প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল আকাশপথে যোগাযোগের একটি কেন্দ্র নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিচয়, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সুশাসনের প্রথম দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক পর্যটক এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কাছে বিমানবন্দরই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও নাগরিকসেবার মান যাচাইয়ের প্রথম ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত অব্যবস্থাপনা, যাত্রী ভোগান্তি, সেবার সীমাবদ্ধতা ও হয়রানির অভিযোগ এখন আর নিছক একটি সেবামূলক ব্যর্থতার বিষয় নয়। অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এসব সমস্যাকে বিশ্লেষণ করলে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, জবাবদিহির ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মতো বিষয় সামনে আসে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও জনআস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কোনো ধরনের অপ্রমাণিত ষড়যন্ত্রের ধারণার ওপর নির্ভর না করে সমস্যাগুলোর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার। বিমানবন্দরে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ, যাত্রীবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
ভোগান্তির দীর্ঘ ইতিহাস ও গণআকাঙ্ক্ষা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি প্রবাসীদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, ট্রলির সংকট, যাত্রীসেবায় সমন্বয়হীনতা এবং কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে রূঢ় আচরণের অভিযোগ—এসব বিষয় যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচক করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে তাঁরা জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। অথচ দীর্ঘ যাত্রা শেষে নিজ দেশে ফিরে বিমানবন্দরে তাঁদের যদি অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, অব্যবস্থাপনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তা ব্যক্তিগত ভোগান্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন টার্মিনাল নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন তার প্রতিফলন ঘটবে যাত্রীসেবার গুণগত মানে। আধুনিক ভবন, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা বৃহৎ স্থাপনা দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না; বরং যাত্রী কতটা দ্রুত, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক সেবা পাচ্ছেন, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম প্রধান সূচক।
জনগণের প্রত্যাশা খুবই স্পষ্ট—বিমানবন্দরে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে যাত্রা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক যাত্রী যেন নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও মর্যাদা পান। ভয়, অনিশ্চয়তা ও হয়রানির পরিবর্তে তাঁরা যেন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা ও আতিথেয়তার পরিচয় অনুভব করেন।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা?
অপরাধবিজ্ঞান ও সুশাসনের তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করে বিমানবন্দরের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের সংঘাত, কার্যকর নজরদারির ঘাটতি, জবাবদিহির দুর্বলতা এবং যাত্রীসেবায় পেশাদারত্বের অভাব।
১. পাবলিক চয়েস থিওরি (Public Choice Theory)
পাবলিক চয়েস থিওরি অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিজস্ব স্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনাও বিবেচনা করতে হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন পুলিশ, নিরাপত্তা বিভাগ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকলে যাত্রীসেবায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কোনো সমস্যার জন্য কোন সংস্থা দায়ী, অভিযোগের নিষ্পত্তি কে করবে এবং সেবার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না থাকলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে যাত্রীকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যেতে হয়, অথচ সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর তদারকি এবং পরিমাপযোগ্য জবাবদিহি। প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি যৌথ সেবার ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
২. রুটিন অ্যাক্টিভিটিজ থিওরি (Routine Activities Theory)
অপরাধবিজ্ঞানের রুটিন অ্যাক্টিভিটিজ থিওরি অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বাড়তে পারে যখন সম্ভাব্য অপরাধী, উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু এবং কার্যকর প্রতিরোধ বা নজরদারির অভাব একই পরিস্থিতিতে উপস্থিত হয়।
বিমানবন্দরের মতো জনসমাগমপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে এই তাত্ত্বিক কাঠামো প্রয়োগ করলে কার্যকর নজরদারি, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বশীল তদারকির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
যদি কোনো এলাকায় অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, সেবার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত না হয় কিংবা যাত্রীদের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার না থাকে, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কুলি, দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অন্য কোনো সেবাদানকারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে মূল বিষয় হলো, ব্যক্তিবিশেষকে দায়ী করার আগে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অনিয়মের সুযোগ কম থাকবে, অভিযোগ দ্রুত শনাক্ত হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩. যাত্রীসেবার ঘাটতি, আতিথেয়তা ও মানবাধিকার
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাষ্ট্রের নাগরিকসেবা ও মানবিক আচরণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। যাত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা আধুনিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা—আইসিএও (ICAO)-এর প্রাসঙ্গিক মানদণ্ড ও নির্দেশনা, প্রযোজ্য জাতীয় আইন এবং মানবাধিকারের নীতির আলোকে যাত্রীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
নিরাপত্তার প্রয়োজনে যাত্রীকে প্রশ্ন করা কিংবা তাঁর লাগেজ পরীক্ষা করা অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অংশ। তবে এসব কার্যক্রম হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয়, পেশাদার ও সম্মানজনক। নিরাপত্তার নামে অযৌক্তিক হয়রানি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি নিরাপত্তা যাচাই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া যায় না।
যাত্রীসেবায় ভাষাগত দক্ষতা, আচরণগত প্রশিক্ষণ, সহমর্মিতা এবং পেশাদারত্বের ঘাটতি থাকলে একটি বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক যাত্রীদের কাছে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
জাতীয় স্থিতিশীলতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় আশু করণীয়
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং যাত্রী হয়রানি কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. একক সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো গঠন
বিমানবন্দরে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এর অর্থ সব সংস্থার আইনগত ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ব্যবস্থার অধীনে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোন সংস্থা কোন কাজের জন্য দায়ী, তা যাত্রীদের কাছেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। এতে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা কমবে এবং সেবার মান উন্নয়নের অগ্রগতি পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
২. দক্ষ জনবল নিয়োগ ও যথাযথ পদায়ন
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল অপরিহার্য। নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন সহায়তা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্নতা এবং গ্রাহকসেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শিফটভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, যাত্রীসংখ্যা ও ফ্লাইটের চাপ বিশ্লেষণ, কাজের সক্ষমতা নিরূপণ এবং জনবল ঘাটতি চিহ্নিত করা জরুরি।
প্রস্তাবিত ছয় হাজার কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে হলে প্রথমে একটি স্বতন্ত্র জনবল চাহিদা সমীক্ষা প্রয়োজন। নিরাপত্তার জন্য চার হাজার এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও যাত্রীসেবার জন্য দুই হাজার কর্মীর প্রস্তাবকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণের আগে দায়িত্বের পরিধি, বর্তমান জনবল, শিফটের সংখ্যা, আর্থিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা উচিত।
শুধু কর্মী বাড়ালেই সেবার মান নিশ্চিত হবে না। যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৩. বাধ্যতামূলক আচরণগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ
বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক কর্মীর জন্য নিয়মিত আচরণগত প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে মানবাধিকারসম্মত যোগাযোগ, যাত্রীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ, বহুভাষিক যোগাযোগের মৌলিক দক্ষতা, বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক যাত্রীদের সহায়তা এবং চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালনের কৌশল।
প্রশিক্ষণ কেবল নিয়োগের সময় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
একটি বিষয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন—যাত্রীকে সম্মান দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি দায়িত্ব পালনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা
লাগেজ চুরি, ঘুষ, জোরপূর্বক বকশিশ আদায়, দালালির মাধ্যমে যাত্রী হয়রানি কিংবা দায়িত্বের অপব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য বিমানবন্দরে ২৪ ঘণ্টা সচল অভিযোগকেন্দ্র, হটলাইন, ডিজিটাল অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানার সুযোগ রাখা যেতে পারে। অভিযোগ গ্রহণের পর তা কোন সংস্থা তদন্ত করবে, কত সময়ের মধ্যে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন ও বিচারিক ক্ষমতার সীমার মধ্যে মোবাইল কোর্ট বা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। তবে তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি কিংবা শাস্তির পরিবর্তে যথাযথ তদন্ত, প্রযোজ্য আইন, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা, চাকরিসংক্রান্ত শাস্তি এবং ফৌজদারি বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী যাত্রী যেন হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হন, সে ব্যবস্থাও জরুরি।
৫. স্মার্ট প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি
আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পুরো বিমানবন্দরের ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল লাগেজ ট্র্যাকিং, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তকরণ, লাগেজ চলাচলের অসংগতি চিহ্নিতকরণ এবং সেবার দীর্ঘসূত্রতার কারণ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা, মানবিক তদারকি এবং ভুল শনাক্তকরণ প্রতিরোধের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত অপারেটর, তথ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালা এবং নিয়মিত কার্যকারিতা যাচাইও প্রয়োজন।
৬. লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার সময়সীমা নির্ধারণ
লাগেজ পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব যাত্রীদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই ফ্লাইট অবতরণের পর লাগেজ বেল্টে লাগেজ পৌঁছানোর সময়, হারানো লাগেজের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ায় যাত্রীসেবার সময় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় বিলম্ব হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কীভাবে তা কমানো যায়—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
যাত্রীদের ফ্লাইটের তথ্য, লাগেজ বেল্টের নম্বর, অভিযোগকেন্দ্রের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বাংলা ও ইংরেজিসহ প্রাসঙ্গিক ভাষায় সহজে দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
৭. স্বাধীন মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ
বিমানবন্দরের সেবার মান মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা এবং যাত্রী সন্তুষ্টি জরিপ চালু করা যেতে পারে। এসব মূল্যায়নে লাগেজ পেতে গড় সময়, অভিযোগ নিষ্পত্তির হার, যাত্রীসেবার মান, অনিয়মের অভিযোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে।
নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না করেও সেবার মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে নিয়মিত অবহিত করা সম্ভব।
এতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর জনআস্থা বাড়বে এবং সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হবে।
উপসংহার
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রবাসী কল্যাণ এবং জাতীয় ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে অব্যবস্থাপনা, যাত্রী হয়রানি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা না করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা শনাক্ত ও সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সংস্কার, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর জবাবদিহি। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী সাব্যস্ত না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী, সাধারণ যাত্রী, বিদেশি পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ, সহজ ও সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা পরস্পরের পরিপূরক। নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করেও যাত্রীদের জন্য মানবিক ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ধারাবাহিক তদারকি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে প্রতিটি যাত্রী রাষ্ট্রের সক্ষমতা, দায়িত্বশীলতা ও আতিথেয়তার পরিচয় পাবেন। এটি কেবল একটি সেবামূলক সংস্কারের বিষয় নয়; বরং জাতীয় মর্যাদা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করার অপরিহার্য উদ্যোগ।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।