অধ্যাপক ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদার যে সুদৃঢ় ভিত্তি আজ রচিত হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনাব তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ শুধু এক অনন্য ঐতিহাসিক মুহূর্তই নয়, বরং তা বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের এক নতুন কূটনৈতিক পুনরুত্থানের প্রতীক। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির রূপরেখা উপস্থাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন যুগান্তকারী অধ্যায়।
ঐতিহাসিক উত্তরসূরি ও বিশ্বমঞ্চের পরম্পরা:
একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রনেতাদের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনা বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিরল। এই পরম্পরার সূচনা করেছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ সাধারণ অধিবেশনে তিনি প্রথম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এক দূরদর্শী দর্শন তুলে ধরেছিলেন।
তারই ধারাবাহিকতায়, দীর্ঘ তেরো বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি তাঁর শাসনামলে একাধিকবার জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বাংলাদেশের হয়ে গণতন্ত্র, আঞ্চলিক সহযোগিতা, মানবাধিকার এবং নারী ও শিশু অধিকারের সপক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর পর, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঠিক একই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটালেন তাঁদের সুযোগ্য পুত্র, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা শুধু একটি পরিবারের গৌরব নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা ও ধারাবাহিক নেতৃত্বের শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা:
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ মিনিটের এই ভাষণটি ছিল সমকালীন ভূরাজনীতি, জলবায়ু সংকট এবং মানব মর্যাদার এক গভীর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ। তিনি তাঁর ভাষণে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বশান্তি, বহুপাক্ষিকতা ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন।
তার ভাষণে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে:
১. ৩-আর (3-R) মেরামত কৌশলঃ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি ‘৩-আর’ কৌশল বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেন।
২. জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice):
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য অবদান রাখা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, তা উল্লেখ করে তিনি উন্নত বিশ্বকে 'কোপ৩১' (COP31) এর প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানান।
৩. তরুণ ও নারী ওয়ান-স্টপ সমৃদ্ধি:
দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্ট-আপ উদ্যোগের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা তিনি বিশ্বমঞ্চে দেন, যা বাংলাদেশের তরুণ জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) ব্যবহারের এক অনন্য প্রয়াস। একই সাথে তিনি নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের বৈপ্লবিক পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন
৪. রোহিঙ্গা সংকট ও ফিলিস্তিন সংহতি:
দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ১.২ মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া তীব্র অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ উল্লেখ করে তিনি মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘের দৃঢ় ভূমিকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনরুত্থাপন করেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণের শেষাংশে যে মূলমন্ত্রটি ঘোষণা করেছেন—"Bangladesh First: Bangladesh for All" (সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ)—তা মূলত সুশাসন, অর্থনৈতিক সমতা ও টেকসই উন্নয়নের এক বৈশ্বিক রূপরেখা।
শহীদ জিয়ার অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বেগম খালেদা জিয়ার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দর্শনকে ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক আত্মমর্যাদাশীল ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সভাপতির আসনে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত গৌরব এবং আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলের ন্যায্য অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রমাণ করে যে, জিয়া পরিবারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বমানবতার এক অন্যতম অগ্রদূত। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই সম্মানজনক ও গৌরবময় ভাবমূর্তি আগামী দিনে আমাদের ভূরাজনৈতিক কূটনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিশু, সোমালিয়া; রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।